বিএসইসির নতুন নিয়মে অস্তিত্ব সংকটে ৩১ মিউচুয়াল ফান্ড
মোবারক হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন বিধিমালায় তালিকাভুক্ত ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৪টি ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩১টিরই অস্তিত্ব ঝুঁকিতে পড়তে পারে। দর নির্ধারিত সীমার নিচে থাকলে এসব ফান্ডকে লিকুইডেশন অথবা ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে হবে।
গত ১২ নভেম্বর প্রকাশিত নতুন বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো বিদ্যমান ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের গড় বাজারদর যদি টানা ছয় মাস ইস্যু মূল্য অথবা ন্যায্য মূল্যভিত্তিক নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি)—যেটি বেশি তার চেয়ে ২৫ শতাংশের বেশি কম থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ফান্ডের ট্রাস্টিকে অবশ্যই একটি অসাধারণ সাধারণ সভা (ইজিএম) ডাকতে হবে।
ওই ইজিএমে ইউনিটধারীদের গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ফান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে মোট ইউনিটের অন্তত চার ভাগের তিন ভাগের (৩/৪) ভোটের সমর্থন প্রয়োজন হবে। বিএসইসির অনুমোদন সাপেক্ষে তখন সংশ্লিষ্ট ফান্ডকে হয় ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডে রূপান্তর করা হবে, নয়তো লিকুইডেশন করা হবে। অর্থাৎ নির্ধারিত মূল্যস্তর ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে ক্লোজড-এন্ড ফান্ডগুলোর সামনে কার্যত অন্য কোনো পথ খোলা থাকছে না।
বিধিমালায় প্রক্রিয়াগত সময়সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ছয় মাসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাস্টিকে রেকর্ড তারিখ ঘোষণা করতে হবে। এরপর ইজিএম আয়োজনের জন্য অন্তত ২১ দিনের নোটিশ দিতে হবে ইউনিটধারীদের।
এসব ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণ না করলে সংশ্লিষ্ট ফান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে। একই ইজিএমে বিদ্যমান ট্রাস্টি, ফান্ড ম্যানেজার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বহাল থাকবে কি না, নাকি পরিবর্তন আনা হবে, সে সিদ্ধান্তও নেওয়া হবে। ফলে অনেক ফান্ডের ব্যবস্থাপনা কাঠামো ও করপোরেট গভর্ন্যান্সে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ২৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৩৪টি ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩১টির ইউনিটদর নতুন বিএসইসি বিধিমালায় নির্ধারিত সীমার অনেক নিচে লেনদেন হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে মাত্র তিনটি ফান্ড প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ক্যাপিএম বিডিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড–০১ এবং রিলায়েন্স ওয়ান।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বিধিমালার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে সংশ্লিষ্ট ফান্ডগুলোর পারফরম্যান্সে বাস্তব উন্নতি দেখাতে হবে। বাজারদর যেন প্রকৃত সম্পদমূল্য বা এনএভির কাছাকাছি থাকে, তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটধারীরা দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশিত রিটার্ন না পাওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। অনেক ফান্ড বছরের পর বছর এনএভির তুলনায় বড় ডিসকাউন্টে লেনদেন হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মতে, বেশ কয়েকটি ফান্ডের ক্ষেত্রে ট্রাস্টি ও ফান্ড ম্যানেজারদের দুর্বল তদারকি ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনাই এই অবস্থার জন্য দায়ী।
নতুন বিধিমালার মাধ্যমে বিএসইসি সেই দীর্ঘদিনের দুর্বলতার ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করল। এখন দেখার বিষয়, ফান্ডগুলো নিজেদের কাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনতে পারে কি না, নাকি একের পর এক ফান্ডকে বাজার থেকে বিদায় নিতে হয়।



