সাখাওয়াত হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারের গভীরতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে লাভজনক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান (এসওই) ও সরকারি অংশীদারিত্ব থাকা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর (এমএনসি) শেয়ার পুঁজিবাজারে আনার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে সরকার। এতে একাধিক লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বাজারে আনা হবে।

ফলে পুঁজিবাজারে বড় বিনিয়োগকারীদের নিয়ে আসতে সরকার কাজ শুরু করেছে। যার ফলে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানির তালিকা করা হচ্ছে। এই কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে বৈঠক করবেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা। বৈঠকে সংশ্লিষ্টদের কাছে পুঁজিবাজারে তালিকভুক্ত না হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হবে। তালিকাভুক্ত হলে বিশেষ কী সুবিধা দেওয়া হবে, সে ব্যাপারে তাদের জানানো হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) সূত্রে এসব জানা গেছে।

বাজার বিশ্লেষকরা বলেন, লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানিকে নিয়ে আসতে পারলে পুঁজিবাজারে বহুজাতিক ও দেশের বড় কোম্পানির তালিকা করা হয়েছে প্রতিটি কোম্পানির সঙ্গে আলাদা বৈঠক করা হবে। এর ফলে বাজারে গতি আসবে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।

এ বিষয় আইসিবির চেয়ারম্যান ড. আবু আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারে গতি আনতে হলে বিনিয়োগকারী বাড়াতে হবে। বিশেষভাবে বহুজাতিক কোম্পানি এবং লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়াতে চেষ্টা চলছে। এসব কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা হলে পুঁজিবাজাওে গতি আসবে। প্রতিটি কোম্পানির ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা। তাদের নিয়ে আলাদাভাবে বসতে হবে। প্রতিটি কোম্পানিকে বিশেষ কিছু সুবিধা দিতে হবে। এসব সুবিধা পেলে কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত হবে।

অর্থনীতির আরেক বিশ্লেষক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গত অর্থবছরেও সরকার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ব্যাংক ঋণ নিয়েছে। সরকারকে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে এবং ঋণনির্ভরতা কমাতে হলে পুঁজিবাজারের ওপর নির্ভর করতে হবে। এ জন্য পুঁজিবাজারে গতি আনতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে। বড় কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে হবে। সরকারকে তালিকা করে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে।

আইসিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারে বহুজাতিক বা ভালো মৌল ভিত্তিসম্পন্ন (ব্লু-চিপ) কোম্পানির সংখ্যা সীমিত। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চাহিদামতো মানসম্মত বড় কোম্পানির অভাবই এখানে বিনিয়োগ ধরে রাখার প্রধান বাধা। ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজার থেকে পিছিয়ে রাখছে।

বিদেশিরা যখন বিনিয়োগ তুলে নিতে চান, তখন ডলারসংকটের কারণে লভ্যাংশ বা মূলধন সহজে নিজ দেশে ফেরত নিতে জটিলতার সম্মুখীন হতে হয় তাদের। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্যসংকট সামগ্রিক অর্থনীতিকে একটি নিম্নস্তরের ভারসাম্যের মধ্যে আটকে রেখেছে।

সামষ্টিক অর্থনীতির এই দুর্বলতা পুঁজিবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া বৈশ্বিক রেটিং সংস্থাগুলো (যেমন ফিচ বা মুডিস) বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারেও। এর ফলে বিদেশি ফান্ড ম্যানেজাররা ফ্রন্টিয়ার বা উদীয়মান বাজার হিসেবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে নতুন করে অর্থ খাটাতে অনীহা প্রকাশ করছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসা পরিচালনার খরচ এখনো দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় বেশি। এ ছাড়া করনীতি বা পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে বাধা দিচ্ছে। বিদেশ থেকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের অর্থ দেশে পাঠানো এবং শেয়ার বিক্রির পর সেই অর্থ নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতির এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভরা। ডিজিটাল সুবিধার অভাব ও আধুনিক ব্যাংকিং সেবার ঘাটতির কারণে অনেকে পুঁজিবাজারে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

প্রতিবদনে বলা হয়েছে, দেশের পুঁজিবাজারে বিভিন্ন সময় ছোট ও দুর্বল কোম্পানির শেয়ার নিয়ে অস্বাভাবিক কারসাজির ঘটনা ঘটে। বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক ও গবেষণানির্ভর বিনিয়োগ করেন। বাজারে সুশাসনের অভাব, ইনসাইডার ট্রেডিং (ভেতরের তথ্য ফাঁস) এবং কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রবণতা বিদেশিদের বাজার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া দেশের আর্থিক খাতের সিংহভাগ ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরশীল।

ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং ব্যাংকগুলোর তারল্যসংকট পুঁজিবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিদেশি পোর্টফোলিও ম্যানেজাররা এই খাত থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে মূলধনি মুনাফা বা ক্যাপিটাল গেইন্স কর নিয়ে নীতিগত পরিবর্তন এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে কর হারের জটিলতা তাদের মধ্যে এক ধরনের নীতিগত অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিদেশিরা সাধারণত স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি কর কাঠামো পছন্দ করেন।

এ ছাড়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের বন্ড মার্কেট ও ব্যাংকগুলোতে সুদের হার বেশ আকর্ষণীয়। দেশের পুঁজিবাজারে যেখানে ঝুঁকি বেশি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমছে, সেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি না নিয়ে নিজ দেশে বা অন্য কোনো উদীয়মান নিরাপদ বাজারে (যেমন ভারত বা ভিয়েতনাম) তহবিল সরিয়ে নেওয়াকে লাভজনক মনে করছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারে দৈনিক লেনদেনের আকার বা তারল্য অন্য অনেক দেশের তুলনায় কম। বড় কোনো বিদেশি ফান্ড যদি একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করতে চায়, তবে বাজারে পর্যাপ্ত ক্রেতা পাওয়া যায় না। এই ‘এক্সিট পলিসি’ বা বাজার থেকে সহজে বের হয়ে যাওয়ার পথ মসৃণ না হওয়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বড় অঙ্কের তহবিল খাটানোর ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করছে।