আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) দীর্ঘ মন্দা ও অস্থিরতা কাটিয়ে অবশেষে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নানামুখী নীতিগত সংস্কার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার যুগোপযোগী পদক্ষেপের ফলে বাজারে গতিশীলতা ফিরে এসেছে। ফলে পুঁজিবাজারে গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন ও সূচক অবস্থান করছে। তবে আস্থাহীন পুঁজিবাজারে এখন আস্থা ফেরানোর কঠিন চ্যালেঞ্জে বিএসইসি।

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাজার কারসাজি, ২০১০ সালের ধসের ক্ষত, নিয়ন্ত্রণহীন মার্জিন ঋণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, নীতিগত অস্থিরতা এবং মানসম্মত কোম্পানির স্বল্পতায় দেশের পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে পৌঁছেছে। নতুন নেতৃত্বে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই আস্থা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে।

যার ফলে সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে ৪৪ পয়েন্ট সূচক বেড়ে অবস্থান ৫ হাজার ৯১১ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এর মাধ্যমে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্টের পর সূচকটি সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে আসলো। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ৫ হাজার ৯৫২ পয়েন্টে ছিলো। ফলে লেনদেনের পাশাপাশি সূচক, মূলধন ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য বেড়েছে। দুই মাসেরও কম সময়ে অর্ধশতাধিক কোম্পানির শেয়ার দর গত এক বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গেছে। প্রায় দেড়শ শেয়ারের দর গত এক বছরের সর্বনিম্ন দরের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে আটগুণ হয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার পুঁজিবাজারে গুরুত্ব দিয়েছে। সদ্য পাস হওয়া বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এর ফলে সরকার গঠনের পাঁচ মাসের মাথায় দীর্ঘ দুই বছরের মধ্যে লেনদেন ও সূচকের সব্বোর্চ অবস্থান রয়েছে। মুলত দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর আস্থাহীনতা ছিল। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির শীর্ষ নেতৃত্বে আমূল পরিবর্তন এনেছেন। করপোরেট ব্যক্তিত্ব মাসুদ খানকে নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তিনি বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিয়েই তার অবস্থান পরিষ্কার করেন। মাসুদ খান কীভাবে দেশের শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করে নতুন করে পুঁজিবাজারকে পুঁজি সরবরাহের প্রধান উৎস হিসেবে গড়তে চান, সে বিষয়ে এক গুচ্ছ লিখিত কর্মপরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন।

দেশের পুঁজিবাজারকে একটি স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ-নির্ভর বাজারে রূপান্তরের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, তার লক্ষ্য বর্তমানের ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ থেকে বাংলাদেশকে একটি ‘এমার্জিং মার্কেট’ এ উন্নীত করা। তিনি বাজারের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য যেখানে প্রয়োজন সেখানে নিয়ন্ত্রণ এবং যেখানে সম্ভব সেখানে সরলীকরণ নীতি অনুসরণের ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, বহুজাতিক কোম্পানি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও বড় স্থানীয় করপোরেটগুলোকে বাজারে আনতে সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। মূলধনের আকার বা ব্যবসা বা ঋণের আকার নির্দিষ্ট পরিমাণ অতিক্রম করা, পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানিগুলোকে বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্ত করার নীতি গ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জোর করে নয়, তাদের পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহে উদ্বুদ্ধ করা হবে। এজন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানি সুবিধা কর্মসূচি চালু করা হবে।

অন্যদিকে যার যার দায়িত্ব তাকেই পালন এবং জবাবদিহি করার কথা জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। স্টক এক্সচেঞ্জকে বাজার মনিটরিং এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানি তদারকিতে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, আইনি সীমার মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জ দায়িত্ব পালন করবে। এ ক্ষেত্রে কমিশন কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। প্রয়োজনে স্টক এক্সচেঞ্জের ক্ষমতা বাড়ানো হবে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে স্টক এক্সচেঞ্জ যথেষ্ট পদক্ষেপ বা ব্যবস্থা নিতে পারছে না মনে হলে বা এক্সচেঞ্জের আইনি এখতিয়ার না থাকলে কমিশন নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।

জানা গেছে, এবারের বাজেটে পুঁজিবাজার বান্ধব বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ সম্প্রতি চৌধুরী বলেছেন, তার সরকার ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন থেকে বেরিয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই। এ জন্য পুঁজিবাজারে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।
পুঁজিবাজারের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি, সুশাসন, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর।

বহুজাতিক, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে বাজারে আনতে হলে শুধু আহ্বান নয়, কর-সুবিধা, সহজ তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন, করপোরেট সুশাসন এবং সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার কঠোরভাবে রক্ষা করতে হবে।

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, নতুন কমিশনের চেয়ারম্যান অনেক জানেন। তিনি নিয়মগুলো সহজ করছেন, যার ফলে বিনিয়োগকারীরা সামনে আশা দেখছেন। সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই কঠোর পদক্ষেপ ও নজরদারির প্রশংসা করে তিনি বলেন, পুরো পৃথিবীতে সবসময় পুঁজিবাজারে সতর্কতা আছে।

মার্কেটে আপস অ্যান্ড ডাউন থাকে, তবে জুয়াড়িরা যাতে বাজার নিয়ে খেলতে না পারে সে জন্য ডিএসইর সার্ভাইলেন্স (পর্যবেক্ষণ) ও আইনি ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটা একটা ভালো দিক। এছাড়া পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কৃত্রিমভাবে সূচক বাড়ানোর চেষ্টা নয়, সুশাসন নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি।

ডিবিএ’র সাবেক সভাপতি আহমেদ রশীদ লালী বলেন, পুঁজিবাজার কোনো জুয়ার আসর নয়; এটি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই বর্তমান ইতিবাচক প্রবণতাকে সাময়িক উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ না রেখে সংস্কার, সুশাসন ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য পুঁজিবাজার গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।

কারণ পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সংকট মূলধনের নয়, আস্থার। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিএসইসিকে প্রথমেই বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং বা অসাধু চক্রের প্রভাবের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারেন, বাজারে সবার জন্য একই আইন প্রযোজ্য। তেমনি ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন বাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। তাই বিএসইসিকে দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।