মেহেদী হাসান, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের সাধারণ (নন-লাইফ) বীমা খাতে এক ধরনের নীরব সংকট ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। দেশে ব্যবসা করা অধিকাংশ সাধারণ বীমা কোম্পানি গ্রাহকদের ঠিকমতো বিমা দাবির টাকা পরিশোধ করছে না। ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানিতে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি দাবি বকেয়া পড়েছে। এই বকেয়া দাবির হার ৭৫ শতাংশ। বীমা কোম্পানি দাবির টাকা পরিশোধ না করায় সৃষ্টি হয়েছে আস্থার সংকট। এরই মধ্যে একাধিক বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে বীমা করা বন্ধ করে দিয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবেই গ্রাহকদের দাবির টাকা পরিশোধ করছে না। তবে ৭৫ শতাংশ দাবি বকেয়া পড়ার জন্য মূল দায়ী সাধারণ বিমা করপোরেশন। অনেক কোম্পানি সাধারণ বিমা করপোরেশন থেকে পুনঃবিমার টাকা ঠিকমতো পাচ্ছে না। ফলে গ্রাহকদের দাবির টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গ্রাহকরা ঠিকমতো দাবির টাকা না পাওয়ায় এ খাতে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সামনে গ্রাহক ও ব্যবসা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে দেশে ব্যবসা করা একাধিক বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে বীমা করা বন্ধ করে, মূল কোম্পানি যে দেশের সেই দেশের বীমা কোম্পানিতে বীমা করছে।

এছাড়া বীমা দাবি পরিশোধকে কেন্দ্র করে দেশের হাইকোর্টে বর্তমানে ৭১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় গ্রাহকদের প্রায় ৩ হাজার ৬৫০ কোটি টাকার দাবি আটকে আছে। এর মধ্যে ৩২১টি মামলা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে এবং ১৩৯টি মামলা ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত অগ্নি, ঝুঁকি ও নৌ-বীমা দাবি সংক্রান্ত এসব মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে গ্রাহকদের করা মামলা ২৫৬টি এবং দাবি পরিশোধ ঠেকাতে বিভিন্ন বীমা কোম্পানির করা রিট ৪৫৮টি। এ ছাড়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আরও ১৪৫টি আপিল বিচারাধীন রয়েছে। এসব আপিলের সঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বীমা দাবি জড়িত। কোনো কোনো মামলা ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তি হয়নি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সালিশি বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট ও আপিলের কারণে দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের পরও বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ পরিশোধে বিলম্ব করছে বীমা কোম্পানিগুলো।

করপোরেট ও বীমা আইন বিশেষজ্ঞ মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বীমা দাবি নিষ্পত্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক গ্রাহক বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও মূল অর্থ উদ্ধার করতে পারেন না। তাঁর মতে, আইন লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যর্থ হচ্ছে।

ব্যাংক ও বীমা আইন বিশেষজ্ঞ ইমরান আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, আইডিআরএর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট এবং পরে আপিল বিভাগে মামলা হওয়ার কারণে পুরো প্রক্রিয়া ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। এতে অনেক গ্রাহক দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন না।

তবে আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, অনেক ক্ষেত্রে জরিপ প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব এবং পরে বীমা কোম্পানির আপত্তির কারণে দাবি নিষ্পত্তি দীর্ঘ হয়। আরবিট্রেশন বোর্ড দ্রুত সিদ্ধান্ত দিলেও পরে উচ্চ আদালতে মামলা হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। আদালতের কার্যক্রমে আইডিআরএর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বীমা কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এদিকে, চট্টগ্রামের ফেমাস এন্টারপ্রাইজের একটি অগ্নি-বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে প্রায় ১০ বছর লেগেছে। সম্প্রতি হাইকোর্ট আইডিআরএর সিদ্ধান্ত বহাল রেখে মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্সকে সুদসহ ক্ষতিপূরণ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে কোম্পানিটি এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।