ডিএসইর ২২ ব্রোকারেজ হাউসে লেনদেন কার্যক্রম বন্ধ
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং তদারকির চরম ঘাটতিতে দেশের পুঁজিবাজারে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। সমন্বিত গ্রাহক হিসাব (সিসিএ) ও প্রকৃত সম্পদে (নেটওয়ার্থ) ঘাটতিসহ নানা অনিয়মের কারণে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ২২টি ট্রেকহোল্ডার কোম্পানির লেনদেন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন এসব হাউসের বিনিয়োগকারীরা। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ডিএসইর কঠোর নজরদারি এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে না।
জানা গেছে, বছরের পর বছর সিসিএ থেকে বিনিয়োগকারীদের জমাকৃত অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে কয়েকটি হাউসের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ, বাংকো সিকিউরিটিজ লিমিটেড, তামহা সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং মশিউর সিকিউরিটিজ লিমিটেড।
এই পাঁচটি ব্রোকারেজ হাউস থেকে বিনিয়োগকারীদের ৬০৭ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে এনআরবিসি সিকিউরিটিজে ৫২ কোটি টাকার ঘাটতি পেয়েছে ডিএসই। যদিও এই হাউসটির লেনদেন চালু রয়েছে।
এদিকে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে আরো ১৭টি সিকিউরিটিজ হাউসের লেনদেন স্থগিত রয়েছে। এগুলো হলো: বেক্সিমকো সিকিউরিটিজ, সিনহা সিকিউরিটিজ, পিএফআই সিকিউরিটিজ, সালতা ক্যাপিটাল, অ্যালায়েন্স সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, ডন সিকিউরিটিজ, ইনডিকেট সিকিউরিটিজ,
আল ফয়সাল সিকিউরিটিজ, শাহ মুহাম্মদ সগির অ্যান্ড কোম্পানি, ট্রেডক্যাপ স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেড, ফারইস্ট স্টক অ্যান্ড বন্ড, কবির সিকিউরিটিজ, মনার্ক হোল্ডিংস, স্নিগ্ধা ইকুইটিজ, সোনালি সিকিউরিটিজ, ট্রেড এক্স সিকিউরিটিজ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজ, সামিন সিকিউরিটিজ।
বিএসইসি মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, গত কয়েক বছরে যেসব ব্রোকারেজ হাউস থেকে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ও অর্থ লুট হয়েছে, তার পুরোটা অবিলম্বে বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসের সম্পদ বিক্রি, সেগুলোর মালিকদের থেকে অর্থ উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা লুটপাট করেছে তাদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ডিএসইর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) আসাদুর রহমান বলেন, অনেক ট্রেকহোল্ডার কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে, যার অনেকগুলোর প্রকৃত মালিকানাই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও রয়েছে। এছাড়া বাকি হাউসগুলোর বিষয়ে ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।’ আবার দুয়েকটির বিষয়ে দুদক তদন্ত করছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৪ জুন প্রধান কার্যালয় বন্ধ করে আত্মগোপনে যাওয়ার পর ক্রেস্ট সিকিউরিটিতে অনুসন্ধান চালিয়ে ১২৬ কোটি টাকার ঘাটতি পায় ডিএসই। ডিএসইর আইনি পদক্ষেপের ফলে কোম্পানির মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহিদুল্লাহ ও তার পরিবারের সদস্যরা গ্রেপ্তার হন । পরবর্তী সময়ে তারা জামিনে বেরিয়ে গেছেন। অন্যদিকে ২০২১ সালের ৭ জুন বাংকো সিকিউরিটিতে ১২৮ কোটি টাকার ঘাটতি শনাক্তের পর ১৫ জুন লেনদেন বন্ধ করে ডিএসই।
সে সময় চেয়ারম্যান আব্দুল মুহিত ব্রিটিশ পাসপোর্টে পালানোর চেষ্টা করলে বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হন। তিনিও পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্তি পান। এছাড়া ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর তামহা সিকিউরিটিতে ১৪০ কোটি টাকা এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে মশিউর সিকিউরিটিতে ১৬১ কোটি টাকার ঘাটতি পাওয়ায় ২৮ অক্টোবর থেকে এগুলোর লেনদেন স্থগিত করে ডিএসই।
ডিএসই কর্মকর্তারা জানান, বছরের পর বছর সমন্বিত গ্রাহক হিসাব বা সিসিএ থেকে বিনিয়োগকারীদের জমাকৃত অর্থ আইনবহির্ভূতভাবে নিজেদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করায় এসব সিকিউরিটিজ হাউসের লেনদেন কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। বন্ধ থাকা মশিউর সিকিউরিটিজের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী জানান, তিনি তার বেতনের টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। ২০২৪ সালে জানতে পারেন তার হাউস বিনিয়োগকারীদের টাকা দিতে পারছে না। এরপর তিনি যোগাযোগ করছেন তার টাকা ফেরতের জন্য। কিন্তু সেই টাকা তিনি ফেরত পাচ্ছেন না।
মশিউর সিকিউরিটিজের পরিচালক শেখ মোগল জান রহমান মৃদুল বলেন, গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে আমাদের কুয়াকাটা আবাসিক হোটেল বিক্রি করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাওনাতে আমাদের বেশ কিছু অ্যাসেট রয়েছে সেগুলোও বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া ব্যবসা সম্প্রসারণে কিছু তহবিল রয়েছে। সবকিছু মিলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে আমরা চেক ইস্যু করতে পারব।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক চেয়ারম্যান আহমেদ ইকবাল হাসান বলেন, কেন দীর্ঘদিন ধরে ট্রেকহোল্ডার কোম্পানির লেনদেন বন্ধ হয়েছে। এর প্রকৃত কারণ বের করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য ফরেনসিক অডিট করলেও আসল তথ্য বের হয়ে আসবে।
তিনি বলেন, আগে এ ধরনের সংকট দেখা দিলে শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হতো। কিন্তু এখন কেন সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। এখানে স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তারা বেনামে ব্যবসা করে সুবিধা নিয়েছেন। ফলে সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। এজন্য ফরেনসিক অডিট করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।



