১৬ বছর পর বেসরকারি কোম্পানি পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ
মনির হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশের পুঁজিবাজারে বেসরকারি কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ আবারও চালু করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন বিধিমালার আওতায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে বড় দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও ছাড়াই সরাসরি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে। এতে কোম্পানির উদ্যোক্তা ও প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডাররা নিজেদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রির সুযোগ পাবেন।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে আইপিওশূন্য পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি আনা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে অতীতে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে শেয়ার বিক্রিতে অনিয়ম ও বিতর্কের অভিজ্ঞতা থাকায় এবার যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা ও শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ এবং উদ্যোক্তাদের শেয়ার ধারণের বিষয়ে বেশ কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত বিধিমালার গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।
তবে দুই বছরের বেশি সময় ধরে নতুন আইপিওবিহীন পুঁজিবাজারে শেষ মুহূর্তে আবেদন জমা দিয়েছে ৬ কোম্পানি। হিসাব বছর শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত ১২০ দিনের সময়সীমা ফুরানোর আগে এসব কোম্পানি শেয়ার ছেড়ে মোট ৬১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করতে চায়। দীর্ঘ মন্দায় বিপর্যস্ত পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তৎপরতার মধ্যেই আবেদনগুলো জমা পড়েছে। পুঁজিবাজারে শেয়ার ছেড়ে অর্থ উত্তোলনের আবেদন জানানো কোম্পানিগুলো হচ্ছে: কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি, পার্কওয়ে প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং পিএলসি, স্ক্যানডেক্স (বিডি) লিমিটেড, অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স পিএলসি, ডজিকন টেকনোলজিস পিএলসি ও প্রটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড।
এর মধ্যে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ৪০০ কোটি টাকা তুলতে চায়। অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে পার্কওয়ে ৪০ টাকা, স্ক্যানডেক্স ১৩ টাকা এবং বাকি তিনটি কোম্পানি ১০ টাকা দরে শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব দিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুঁজিবাজারে আর কোনো নতুন আইপিও আসেনি। রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর আগে জমা থাকা আইপিও আবেদনগুলো বাতিল বা ফেরত পাঠায়। তবে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটাতে এখন নতুন আইপিও অনুমোদনে আগ্রহী বিএসইসি। এ জন্য সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহে উৎসাহিত করার পাশাপাশি আইপিও বিধিমালায় বিভিন্ন ছাড় ও শর্ত শিথিলের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী, হিসাব বছর শেষ হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে আইপিও আবেদন জমা দিতে হয়। এই সময়সীমা বিবেচনায় জুনে হিসাব বছর শেষ হওয়া কোম্পানিগুলোর জন্য ২৮ অক্টোবর আবেদন জমা দেওয়ার শেষ দিন। সেদিনই ছয় কোম্পানি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) আইপিও আবেদন জমা দেয়। এখন বিএসইসিকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে এসব আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে। অবশ্য অনুমোদন নির্ভর করবে আর্থিক সক্ষমতা, প্রকাশিত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও তালিকাভুক্তির যোগ্যতা যাচাইয়ের ওপর। বিশেষ করে অতীতে দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিকে আইপিও অনুমোদন দেওয়ার অভিজ্ঞতায় নতুন আবেদনগুলোর যাচাই-বাছাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিএসইর ওয়েবসাইটে পাওয়া প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায় কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কোম্পানিটির শেয়ার ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রসপেক্টাসে প্রতিটি শেয়ারের নির্দেশক মূল্য ২৪২ টাকা দেখানো হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত মূল্য নয়। কোম্পানিটির ইস্যু ব্যবস্থাপক ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
ডিবিএল গ্রুপের পার্কওয়ে প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং পিএলসি ১ কোটি ৯৫ লাখ শেয়ার প্রতিটি ৪০ টাকা দরে ছেড়ে ৭৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়। এর মধ্যে শেয়ারপ্রতি ৩০ টাকা প্রিমিয়াম। প্রতিষ্ঠানটির ইস্যু ব্যবস্থাপক শান্তা ইকুইটি লিমিটেড। স্ক্যানডেক্স (বিডি) লিমিটেড ৫৫ কোটি টাকা সংগ্রহের প্রস্তাব দিয়েছে। কোম্পানিটি প্রতিটি শেয়ার ১৩ টাকা দরে ছাড়তে চায়। এর মধ্যে ৩ টাকা প্রিমিয়াম। ইস্যু ব্যবস্থাপক এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেড।
আর্থিক খাতের অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স পিএলসি ৩৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা সংগ্রহের আবেদন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ৩ কোটি ৪৬ লাখ ৫০ হাজার শেয়ার প্রতিটি ১০ টাকা দরে ছাড়তে চায়। ইস্যু ব্যবস্থাপক ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
প্রযুক্তি খাতের ডজিকন টেকনোলজিস পিএলসি ৩ কোটি শেয়ার ছেড়ে ৩০ কোটি টাকা এবং প্রটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড দেড় কোটি শেয়ার ছেড়ে ১৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়। উভয় প্রতিষ্ঠানের ইস্যু ব্যবস্থাপক আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড।
ছয় কোম্পানির প্রস্তাবিত অর্থের প্রায় ৬৫ শতাংশই কনফিডেন্স পাওয়ারের। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি আয় ৩১ টাকা ৮৩ পয়সা। অন্যদিকে পার্কওয়ে প্যাকেজিংয়ের শেয়ারপ্রতি আয় ৩ টাকা ৭৪ পয়সা এবং অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্সের মাত্র ৩২ পয়সা। ফলে আবেদনকারী কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতায় বড় পার্থক্য রয়েছে। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, সব বেসরকারি কোম্পানি সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে না। এ সুবিধা পেতে হলে কোম্পানিতে সরকারের অন্তত ১০ শতাংশ মালিকানা থাকতে হবে অথবা কোম্পানির অন্তত ৫১ শতাংশ মালিকানা বিদেশিদের হাতে থাকতে হবে।
এ ছাড়া অন্তত ৫০০ কোটি টাকার নিট সম্পদ রয়েছে এমন তপশিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানি এ প্রক্রিয়ায় তালিকাভুক্ত হতে পারবে। বার্ষিক অন্তত এক হাজার কোটি টাকা টার্নওভার রয়েছে, এমন কোম্পানিও এ সুযোগ পাবে। পাশাপাশি স্টক এক্সচেঞ্জ ও ডিপোজিটরি প্রতিষ্ঠান সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য বিবেচিত হবে।
বিএসইসির প্রত্যাশা, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে আনা সম্ভব হবে। যেসব কোম্পানির নতুন মূলধনের প্রয়োজন নেই, কিন্তু উদ্যোক্তারা বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি করতে চান, তাদের জন্যও এ প্রক্রিয়া বিকল্প সুযোগ তৈরি করবে।
পুঁজিবাজারে আইপিওর প্রধান উদ্দেশ্য নতুন কোম্পানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করা। ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিল্প সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই অর্থ ব্যবহার করা যায়। একই সঙ্গে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের বিকল্প বাড়ে, বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের আস্থা শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।



