নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রতি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা বাড়ছে

   13/01/2019

mustafa kamalদেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের প্রতি পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা বাড়ছে। নির্বাচনের আগে সৃষ্টি পতনের রেশ কাটিয়ে সম্প্রতি কিছুটা চাঙা হয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। প্রতিদিনই লেনদেন হওয়া সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার পাশাপাশি উলম্ফন ঘটছে মূল্য সূচকে। সেই সঙ্গে লেনদেনেও দেখা দিয়েছে তেজিভাব। ফলে পুঁজিবাজার নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

বড় ধরনের রাজনৈতিক হানাহানি ছাড়াই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া এবং সরকারের ধারাবাহিকতা থাকায় পুঁজিবাজার পতনের ধারা কাটিয়ে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা। তবে বাজারের চাঙাভাব এবং লেনদেনের তেজিভাবের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী পরিবর্তন হওয়া ‘টনিক’ হিসেবে কাজ করেছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।

Page-01 (31)কোন প্রকার সংহিসতা ছাড়াই গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর এতে নতুন বছরে অর্থাৎ ২০১৯ সালে নতুন সরকার, নতুন অর্থমন্ত্রী এবং সরকারের আগামী পাঁচ বছরের ইশতেহারে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনেক প্রতিশ্রুতি রয়েছে অর্থাৎ এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পুঁজিবাজার ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে।

সামনে এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। কেননা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ যিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব আসছেন তার পুঁজিবাজার সম্পর্কে ভালো ধারণা রয়েছে। তাই এসব বিষয় তিনি নজরদারিতে রাখবেন। এমন ধারনা থেকেই বাজারে চাঙাভাব বিরাজ করেছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Page-02 (8)তারা বলছেন, সদ্য সাবেক হওয়া অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত দায়িত্ব থাকা অবস্থায় পুঁজিবাজার নিয়ে নানা নেতিবাচক মন্তব্য করেন। তিনি (মুহিত) কখনও পুঁজিবাজারকে ‘জুয়া খেলা’ আবার কখনও ‘ফটকা বাজার’ বলেও অভিহিত করেন। অর্থমন্ত্রীর এমন ‘বেফাঁস কথা’র কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারের ওপর।

ফলে বিনিয়োগকারীদের বেশির ভাগই আবুল মাল আবদুল মুহিতের ওপর নাখোশ ছিলেন। কিন্তু নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল যেমন মেধাবী, তেমনি অভিজ্ঞ। কথা-বার্তাতেও সংযত। পুঁজিবাজার সম্পর্কেও তার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। সুতরাং আগের অর্থমন্ত্রীর মতো তিনি বাজার নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করবেন না। এ কারণে নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রতি বিনিয়োগকারীদের এক ধরনের আস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। এরই বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে বর্তমান পুঁজিবাজারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে যে ঊর্ধ্বমুখিতা দেখা দিয়েছে তা খুবই ভালো লক্ষণ এবং প্রত্যাশিত ছিল। তবে এ বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিচক্ষণতার সঙ্গে বিনিয়োগ করতে হবে। কোনো কোম্পানিতে বিয়োগের ক্ষেত্রে সেই কোম্পানির সার্বিক তথ্য পর্যালোচনা করতে হবে। সেই সঙ্গে দুর্বল কোম্পানির শেয়ার নিয়ে যাতে কোনো চক্র ফায়দা লুটতে না পারে সে জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার পদক্ষেপ নিয়ে শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে হবে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮ সালের শুরুর তেজিভাব থাকলেও প্রথম চার মাস পার হতেই লেনদেনের পাশাপাশি মূল্য সূচকেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। নির্বাচনের বছর হওয়ায় সেই নেতিবাচক প্রবণতা বছরের প্রায় সময়জুড়ে অব্যাহত থাকে। তবে নির্বাচনের আগের সপ্তাহে হঠাৎ করেই টানা ঊর্ধ্বমুখিতার দেখা মেলে।

নির্বাচনের পরের কার্যদিবসেই উলম্ফন দেখা যায় মূল্য সূচকে। তার পরের কার্যদিবসে সূচকের বড় উত্থানের পাশাপাশি গতি আসে লেনদেনেও। ফলে নির্বাচনের পর প্রথম ছয় কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্য সূচক বেড়েছে ৩৮৬ পয়েন্ট। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আবদুল মুহিতের পরিবর্তে আ হ ম মুস্তফা কামালের নাম ঘোষণা আসার দিন ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স বাড়ে ৯৭ পয়েন্ট।

নতুন অর্থমন্ত্রীর শপথ নেয়ার পরের কার্যদিবসে সূচক বেড়েছে ১১৭ পয়েন্ট, যা গত দশ মাসের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ উত্থান। সূচকের বড় উত্থানের সঙ্গে লেনদেন পৌঁছে গেছে হাজার কোটি টাকার ঘরে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, অর্থমন্ত্রী পরিবর্তন হওয়া পুঁজিবাজারের জন্য সব থেকে ভালো সংবাদ। কারণ আবুল মাল আবদুল মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকলে কখন কী বলে ফেলেন তার ঠিক নেই। তিনি হয়তো হঠাৎ এমন মন্তব্য করে ফেলতেন যে, ভালো বাজারও খারাপ হয়ে যেত।

অতীতে অনেকবার এমন ঘটনা ঘটেছে। পুঁজিবাজার খুবই সেনসেটিভ (স্পর্শকাতর)। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের যেকোনো মন্তব্যে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, আবার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে পারে। আমরা আশা করছি নতুন অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজার নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করবেন না। বরং বাজারের উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে ভূমিকা রাখবেন। পুঁজিবাজারের ওপর নতুন অর্থমন্ত্রীর যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এক উপদেষ্টা বলেন, ‘ মোটামুটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন হওয়ায় পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন অদূর ভবিষ্যতে অর্থনীতিতে চাপ আসবে না। অর্থনীতি একটি স্বস্তিকর পরিবেশে আছে। সমস্যা আছে শুধু ব্যাংক খাতে। ব্যাংকের পিই রেশিও (মূল্য আয় অনুপাত) যথেষ্ট কম।

সুতরাং এ খাতে বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ আছে। টানা উত্থানের কারণে বাজার যে অবস্থায় এসেছে তাতে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। তবে দেখতে হবে বাজারে কারসাজি আছে কিনা এবং খারাপ শেয়ারের দাম বাড়ছে কিনা। সেই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে বাজারে যাতে ২০১০ সালের মতো আবার বুদবুদ সৃষ্টি না হয়।

বিশ্লেষকরা বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘এ ঊর্ধ্বমুখী বাজারে বিনিয়োগকারীদের বাছ-বিচার করে বিনিয়োগ করতে হবে। কোম্পানির আর্থিক অবস্থা খতিয়ে দেখে বিনিয়োগ করতে হবে। জেড গ্রুপের শেয়ার কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। তারা আরও বলেন, নির্বাচনের পর সরকারের ধারাবাহিকতার একটি প্রতিফলন বাজারে পড়ছে এবং অংশগ্রহণ বাড়ছে।

বাজারের বর্তমান চিত্রকে পজেটিভ। এটাকে ধরে রাখতে হবে। এজন্য ভালো ভালো শেয়ার আনতে হবে। সেই সঙ্গে আজেবাজে শেয়ার নিয়ে খেলাধুলা করা শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মৌলিক শেয়ারে বিনিয়োগ করতে হবে। কাজেই এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার চ্যালেঞ্জ হবে বাজারকে কুলডাউন করা। সরবরাহ ব্যবস্থাকে ফ্লেক্সিবল করা। যাতে বিনিয়োগকারীদের চাহিদা পূরণ করা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড পাবলিক পলিসি বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘বাজারে যে উত্থান হয়েছে তা স্বাভাবিক। অর্থমন্ত্রী পরিবর্তন হয়েছে, নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে; এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। এছাড়া ২০১৯ সালে বাংলাদেশের ক্যাপিটাল ফ্লো বাড়বে। আর্থিক খাতে যে সঙ্কট ছিল তা অনেকখানি লাঘব হবে। অর্থমন্ত্রী পরিবর্তন মানুষের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার চ্যালেঞ্জ হবে বাজারকে কুলডাউন করা। সরবরাহ ব্যবস্থাকে ফ্লেক্সিবল করা, নতুন নতুন শেয়ার নিয়ে আসা। যাতে বিনিয়োগকারীদের চাহিদা পূরণ করা যায়। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের হুজুগে বিনিয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং কোম্পানি দেখে বিনিয়োগ করতে হবে। কিছুতেই জাঙ্ক বা বাজে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা ঠিক হবে না।’

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক রকিবুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনের পর সরকারের ধারাবাহিকতার একটি প্রতিফলন বাজারে পড়ছে এবং অংশগ্রহণ বাড়ছে। আমি বাজারের বর্তমান চিত্রকে পজেটিভভাবে দেখছি। এটাকে ধরে রাখতে হবে। এজন্য ভালো ভালো শেয়ার আনতে হবে। সেই সঙ্গে আজেবাজে শেয়ার নিয়ে খেলাধুলা করা শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মৌলিক শেয়ারে বিনিয়োগ করতে হবে। মৌলিক শেয়ারে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারীরা ঠকবেন না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পুঁজিবাজার ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পথে বিনিয়োগকারীরা

Adamin protikhon  18/07/2019

দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে দরপতন ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বারকলিপি দিতে যাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। ১৫ দফা দাবি নিয়ে ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীর হয়ে একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর কাছে…

পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান বিনিয়োগকারীরা

Adamin protikhon  18/07/2019

দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চান বিনিয়োগকারীরা। পুঁজিবাজারে দরপতনের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবারও মতিঝিলের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনকালে এ কথা বলেন তারা।…

ডেঞ্জারজোনে ফার্স্ট ফাইন্যান্স, সঞ্চিতি ঘাটতি ৪৬ কোটি টাকা

Adamin protikhon  18/07/2019

দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক খাতের ফার্স্ট ফাইন্যান্স এক পরিচালককে ঋণ প্রদানের অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনিয়ম করেছে। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে…

ফোর্সড সেলের আতঙ্ক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাড়ছে!

Adamin protikhon  17/07/2019

মনির হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে চলছে ধারাবাহিক দরপতন। নানামুখী গুজব বিভিন্ন ইস্যুতে চলমান রয়েছে এ পতন। পতন আরও বেগবান করছে প্যানিক সেল। পতন…

মিউচুয়াল ফান্ডে চমক দুরবস্থা আর্থিক খাতে!

Adamin protikhon  16/07/2019

মিজানুর রহমান, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে মন্দাবস্থার মধ্যে মিউচুয়াল ফান্ডে গতি ফিরেছে। অন্যদিকে আর্থিক খাতের ব্যাংক, বীমা ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান পড়েছে চরম দুরবস্থার মধ্যে।…