পুঁজিবাজারে টানা দরপতনে সর্বশান্তের পথে বিনিয়োগকারীরা, বাজার ছেড়েছেন ৬২ হাজার
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বাজারে ক্রমাগত দরপতনের ফলে পুঁজি হারিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা ছিল পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন মেলেনি। এমন পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী, কিছু ব্রোকার প্রতিনিধি এবং বিনিয়োগকারীদের সংগঠনগুলো মনে করছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতাই পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট ও অস্থিরতার মূল কারণ।
ফলে দেশের পুঁজিবাজার যেন ধীরে ধীরে এর পথ হারাচ্ছে। এক সময় এই বাজার ছিল স্বপ্ন বুননের ক্ষেত্র হাজারো সাধারণ বিনিয়োগকারী আশায় বুক বাঁধতেন, শেয়ার কিনে জীবনের উন্নতির গল্প লিখতেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের টানা মন্দাভাব, আস্থাহীনতা আর অস্থিরতায় সেই স্বপ্নের জায়গায় এখন ভর করছে হতাশা।
এর ফলে মাত্র ৯ মাসেই ৬২ হাজার বিনিয়োগকারী নিস্কিয় হয়ে পড়েছেন। কেউ পুরোপুরি বাজার ছেড়েছেন, আবার অনেকেই শেয়ারহীন হয়ে অনিশ্চয়তার দোলাচলে সময় পার করছেন। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) সর্বশেষ তথ্যে এ চিত্রই উঠে এসেছে।
কেন বিনিয়োগকারীরা বাজার বিমুখ হচ্ছেন? এই প্রশ্নের জবাবে একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মূল কারণ আস্থার সংকট। কারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের দাবী জানিয়ে আসলেও বাস্তবে কোন মিল দেখা যাচ্ছে না।
একটি শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি একটি আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফ্লোর প্রাইসের কারণে বছরের পর বছর তাঁদের পুঁজি আটকে ছিল। এখন ফ্লোর উঠিয়ে দেওয়ার পরও শেয়ারের দরপতন তাঁদের আরো হতাশ করেছে। এর মধ্যে বাজারে আস্থা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে ভালো কোনো কম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাবও (আইপিও) নেই, যা নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করতে পারত।
করোনা কালে বাজারে আসা একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী আফতাব হোসেন বলেন, ব্যাংকের চেয়ে বেশি লাভের আশায় জমানো টাকা পুঁজিবাজারে খাটিয়েছিলাম। কিন্তু গত দুই বছরে লাভের বদলে লোকসানই হয়েছে। এখন যা আছে, তা-ই তুলে নিয়ে ব্যাংকের এফডিআরে রাখছি। অন্তত সেখানে আসল টাকাটা তো নিরাপদ থাকবে।
বাজার বিশ্লেষক মো. মামুনুর রশীদ বলেন বলেন, গত ১৪ মাসে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন কমিশন ও নতুন নেতৃত্ব এলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরেনি। যারা ১৪ মাস আগে ১০০ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন, আজ তারা নিজেদের অর্থ মাত্র ৫০ টাকায় দেখতে পাচ্ছেন। এ যেন এমন সময়, যখন দেশ হাসে, বিনিয়োগকারী কাঁদে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পুঁজিবাজারকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে চলবে না। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিরই একটি প্রতিচ্ছবি। বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে, যা সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো এখন আমানতের ওপর ১১ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে ব্যাংকে টাকা রাখাকেই বেশি যৌক্তিক মনে করবেন।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের সুদহার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এখন পুঁজিবাজারের ঝুঁকি এড়িয়ে সঞ্চয়পত্র বা ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটের মতো নিরাপদ বিনিয়োগে ঝুঁকছেন। ফলে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) লেনদেন নেমে এসেছে তলানিতে, যা বাজারের স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সিডিবিএলের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পুঁজিবাজারে মোট বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৪৫২টি। ৯ মাসের ব্যবধানে অর্থাৎ গত ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে এই সংখ্যা ৩০ হাজার ২২৫টি কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৩২ হাজার ২২৭টিতে। তবে এর চেয়েও আশঙ্কার বিষয় হলো, শেয়ারশূন্য বিও হিসাবের বৃদ্ধি।
গত বছরের ডিসেম্বরে শেয়ারশূন্য বিও হিসাব ছিল তিন লাখ ৪৩ হাজার ৯৭৪টি, যা এই সেপ্টেম্বরে ৩১ হাজার ৮৮৫টি বেড়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার ৮৫৯টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ যে বিনিয়োগকারীরা এখনো বাজার ছাড়েননি, তাঁদের একটি বড় অংশ পোর্টফোলিও খালি করে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে আছেন। সব মিলিয়ে বিও হিসাব বন্ধ করা এবং শেয়ারশূন্য হয়ে পড়া এই দুই ধরনের বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ৬২ হাজার ১১০। এই রক্তক্ষরণ হয়েছে সব ধরনের বিনিয়োগকারীর মধ্যেই।
৯ মাসে পুরুষ বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব কমেছে ১৯ হাজার ৭২২টি এবং নারী বিনিয়োগকারীর হিসাব কমেছে ১০ হাজার ৭৩৫টি। একই সময় দেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কমেছে ২৭ হাজার ৫৬৭টি বিও এবং বিদেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিও হিসাব কমেছে দুই হাজার ৮৯০টি। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এই প্রস্থান বুঝিয়ে দেয়, দেশের অর্থনীতির প্রতি তাঁদের আস্থায়ও চিড় ধরেছে।



