পুঁজিবাজারে টানা দরপতনে বিনিয়োগকারীদের নতুন করে পুঁজি উধাও ৩০ শতাংশ
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পতন সামলে উঠতে পারছে না দেশের পুঁজিবাজার। এক সময় ঘুরে দাঁড়ানো পুঁজিবাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জুন জুলাই আগস্ট মাস পর্যন্ত টানা উত্থানের পর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে সূচকের দরপতন শুরু হলেও এখন পর্যন্ত টানা দরপতনে ফের শঙ্কার মুখে বিনিয়োগকারীরা। ফলে নতুন করে দরপতনে বিনিয়োগকারীরা ৩০ শতাংশের বেশি মুলধন হারিয়েছে।
এছাড়া চলতি সপ্তাহে টানা তিন কার্যদিবস দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মুখে ফিরে এসেছে পুরোনো উদ্বেগ, বাড়ছে ক্ষতির বোঝা। পুঁজিবাজারের অস্থির আচরনে গত ৯ মাসেই ৬২ হাজার বিনিয়োগকারী নিস্কিয় হয়ে পড়েছেন। কেউ পুরোপুরি বাজার ছেড়েছেন, আবার অনেকেই শেয়ারহীন হয়ে অনিশ্চয়তার দোলাচলে সময় পার করছেন।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স সেপ্টেম্বর নাগাদ ৫ হাজার ৫০০ পয়েন্ট ছুঁয়ে যায়, আর দৈনিক লেনদেন পৌঁছায় ১,৫০০ কোটি টাকার ওপরে। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি বিতর্কিত চিঠি বাজারে হঠাৎ অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সেই ধাক্কা সামলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হলেও ফের সাম্প্রতিক কার্যদিবসগুলোতে সূচক আবারও দরপতনের দিকে।
ফলে সবার চোখের সামনে প্রতিদিনই হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার বাজার মূলধন। আতঙ্কে দিন কাটছে বিনিয়োগকারীদের। সূচকের টানা দরপতনে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে। তাদের পিঠ রীতিমতো দেওয়ালে ঠেকে গেছে। ফলে লাখো বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে বাজারবিমুখ হয়ে পড়ছেন। ফলে বিনিয়োগকারীদের আর্তনাদ বাড়ছে। যদিও পুঁজিবাজার সংক্রান্ত বিষয়ে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ইতিপূর্বে বারবার তৎপরতা দেখিয়েছেন; কিন্তু তাতে করেও বিশেষ কোনো ফল লাভ হয়নি।
তবে পুঁজিবাজার টানা দরপতন হলেও বাজার ইস্যুতে বিষয়টি নিয়ে কাউকে তেমন সিরিয়াস ভূমিকা গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে না। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপরও ক্ষোভ বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে দেশের আর্থিক খাতের পুঁজিবাজার যে অন্তিম শয়ানে চলে যাবে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।
অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী কাজী হোসাইন আলী বলেন বলেন, গত ১৫ বছর ধরে একটি স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের জন্য বার বার জোর দাবী জানিয়ে আসছি। তবে কোন সফলতা আসেনি। বাজার আজ ভাল তো কাল খারাপ। এ অবস্থার মধ্যে বছরের পর বছর পার করছি। এ অবস্থার মধ্যে নতুন করে গত ১৪ মাসে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন কমিশন ও নতুন নেতৃত্ব এলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরেনি। যারা ১৪ মাস আগে এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন, আজ তারা নিজেদের অর্থ মাত্র ৫০ হাজার টাকায় দেখতে পাচ্ছেন। এ যেন এমন সময়, যখন দেশ হাসে, বিনিয়োগকারী কাঁদে।
এম সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা আমাদের বাঁচান, আমরা নি:স্ব একথা টুকু একটু পত্রিকায় লিখেন। ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে আজ আমার পুঁজি শেষ। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিক্রয় করলেও ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা বিক্রয় করতে পারি। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজারে আছি। কিন্তু এমন খারাপ সময় কখনো দেখেননি বলেন তিনি।
স্টক বন্ডের বিনিয়োগকারী আকরাম হোসেন বলেন, পুঁজিবাজারে টানা দরপতনের শেষ কোথায়। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজার দরপতন চলছে। মাঝে মধ্যে সূচকের উত্থান হলেও আমাদের শেয়ারের দাম বাড়েনি। আমাদের পুঁজি শেষ। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে আজ আমরা নি:স্ব। আগে বাজার খারাপ হলেও কিছুদিনের মধ্যেই আবার ঘুরে দাঁড়াত। কিন্তু গত এক মাসের বেশি সময় ধরে বাজার খারাপ যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পুঁজিবাজারকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে চলবে না। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিরই একটি প্রতিচ্ছবি। বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে, যা সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো এখন আমানতের ওপর ১১ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে ব্যাংকে টাকা রাখাকেই বেশি যৌক্তিক মনে করবেন।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের সুদহার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এখন পুঁজিবাজারের ঝুঁকি এড়িয়ে সঞ্চয়পত্র বা ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটের মতো নিরাপদ বিনিয়োগে ঝুঁকছেন। ফলে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) লেনদেন নেমে এসেছে তলানিতে, যা বাজারের স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।



