পুঁজিবাজারে লাভজনক ৫০ কোম্পানি আনতে হার্ডলাইনে সরকার
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দীর্ঘদিনের ভালো শেয়ারের ঘাটতি কাটাতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানি ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন লাভজনক ৫০ টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের বহুল প্রতীক্ষিত চাহিদা পূরণ হতে যাচ্ছে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মুলত পুঁজিবাজারে ভালো শেয়ার সরবরাহে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এতে পূরণ হতে চলেছে বিনিয়োগকারী, বাজার মধ্যস্থতাকারী ও বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের দাবি। এক্ষেত্রে বহুজাতিক কোম্পানিসহ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন লাভজনক মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তিন স্তরে পুরো বিষয় কার্যকর করা হচ্ছে।
ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর ছাড়সহ বিভিন্ন প্রণোদনা থাকলেও দেশি-বিদেশি বড় কোম্পানিগুলোর আগ্রহ এখনো সীমিত। এ অবস্থায় এসব কোম্পানিকে পুঁজিবাজারমুখী করতে আইনগত বাধ্যবাধকতা আরোপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
মুলত উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। তাই পুঁজিবাজারে গতি আনতে ৫০টি বড় প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্তি করার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। তালিকাভুক্তি হলে এসব প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে।
আর বাজারে না এলে কোনো ধরনের নতুন সুবিধা দেওয়া হবে না। আর করছাড়সহ অনেক ধরনের সরকারি সুবিধা কমানো হবে। এ নির্দেশ কার্যকরে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করার কথা বলা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মুখপাত্র ও পরিচালক মো. আবুল কালাম বলেন, পুঁজিবাজারে গতি আনতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ওপর থেকে নির্ভরতা কমাতে হচ্ছে। বড় মাপের কোম্পানিকে এই বাজারে আনতে বহুদিন ধরে চেষ্টা চলছে। তবে কোনো কাজ হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে আবারও যোগাযোগ করা হয়েছে। সরাসরি তালিকাভুক্তি করে এসব কোম্পানিকে বাজারে আনা হবে। বাজারে এলে তাদের বিভিন্ন ধরনের সরকারি সুবিধা দেওয়া হবে। তা না হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হবে সরকার। প্রয়োজনে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হবে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ-এর (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বড় মাপের কিছু কোম্পানি পুঁজিবাজারে এলে এ বাজারে গতি আসবে। আমরা চেষ্টা করছি তালিকা করে কিছু কোম্পানি আনতে। এসব কোম্পানি ভারত, পাকিস্তানসহ অনেক দেশে তালিকাভুক্ত। আমাদের দেশে পুঁজিবাজারে না এলে করছাড় সহায়তাসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় নেই। আশা করি এবার পুঁজিবাজারে এসব কোম্পানিকে আনা সম্ভব হবে।
অর্থ সংগ্রহের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে ধরা হয় উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার পুঁজিবাজারে গতি আনতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকার বর্তমান মেয়াদে এই বাজারে বড় মাপের কোম্পানি তালিকাভুক্তি করতে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
শুধু মূলধন জোগানের জন্য নয়, এ দেশের মানুষের স্বার্থেই শেয়ারবাজারে আনা উচিত। আর কোম্পানিগুলোরও উচিত দায়বদ্ধতা থেকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া। বিষয়টি নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানিয়েছেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে তারা বাড়তি কোনো সুবিধা পান না। বিদ্যমান করহার বেশি, তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াও জটিল। ফলে অর্থায়নের বিকল্প উৎস থাকতে তারা পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। অনেকে আয় বাড়ানোর জন্য সঞ্চয়ের প্রায় সবটা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু নিঃস্ব হন। গত ১৫-১৬ বছরে পুঁজিবাজার ছেড়েছেন ১৪ লাখ বিনিয়োগকারী। বিগত সরকারের প্রভাবশালী বড় মাপের কিছু অসৎ বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার থেকে অর্থ আত্মসাৎ করে পাচার করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এখন শেয়ারবাজারের ঝুঁকি এড়িয়ে চলছেন।
তারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের চেয়ে সঞ্চয়পত্র বা ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটের মতো নিরাপদ বিনিয়োগে ঝুঁকছেন। পুঁজিবাজার ছাড়ার কারণ হিসেবে অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিচার না হওয়াকেও দায়ী করছেন তারা। এদের শাস্তির আওতায় আনতে সরকার কঠোর। আবার কেউ যাতে একই দুর্নীতি করতে না পারে সে জন্য সরকার পুঁজিবাজারে নিয়মিত নজরদারি করছে। দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে শাস্তি কার্যকর করা হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা ফিরবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহুদিন থেকে পুঁজিবাজারে বহুজাতিক, বেসরকারি ও সরকারি কোম্পানি আনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি বললেই চলে। এদের মধ্যে ১০টি বহুজাতিক কোম্পানি হলো: ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো),
সাইনোভিয়া বাংলাদেশ লিমিটেড, নোভার্টিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড, সিনজেন্টা বাংলাদেশ লিমিটেড, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোং লিমিটেড, সিলেট গ্যাসফিল্ডস কোং লিমিটেড কর্ণফুলী গ্যাস কোং লিমিটেড, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোং লিমিটেড এবং নেসলে বাংলাদেশ পিএলসি।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে সরকারি মালিকানার ৫ শতাংশ এবং বিদেশি কোম্পানির ৫ শতাংশ মিলে মোট ১০ শতাংশ শেয়ার পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি যেসব কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার বিষয়ে আলোচনা চলছে, এর মধ্যে রয়েছে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, বাখরাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি, জালালাবাদ গ্যাস সিস্টেম,
বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি, সোনারগাঁও হোটেল, ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, লিকুফায়েড পেট্রোলিয়ম গ্যাস, সিলেট গ্যাসফিল্ড, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি, বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ড, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড, প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ, চিটাগাং ডকইয়ার্ড, কর্ণফুলী পেপার মিলস, বাংলাদেশ ইনস্যুলেটর অ্যান্ড স্যানিটারিওয়্যার ফ্যাক্টরি, আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি, ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, টেলিটক ও টেলিফোন শিল্প সংস্থা।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের মোট বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৩২ হাজার ২২৭টি। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৪৫২টি।
৯ মাসের ব্যবধানে কমেছে ৩০ হাজার ২২৫টি বিও হিসাব। একই সময়ে শেয়ারশূন্য বিও হিসাব বেড়েছে ৩১ হাজার ৮৮৫টি। সব মিলিয়ে ৬২ হাজার ১১০ বিনিয়োগকারী কার্যত বাজারবিমুখ হয়েছেন। অন্যদিকে শেয়ারশূন্য বিও হিসাব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৮৫৯টিতে, যা গত বছরের ডিসেম্বরে ছিল ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৯৭৪টি।



