ইমান হোসাইন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ধরণের নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে পুঁজিবাজার। পুঁজিবাজার যেমন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন সংগ্রহের প্রধান উৎস, তেমনি সাধারণ মানুষের জন্য একটি বিকল্প বিনিয়োগের স্থান। তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বারবার আস্থার সংকট, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোন অবদান রাখতে পারছে না পুঁজিবাজার। তাছাড়া গত এক মাসে ডিএসই ৫২৭ পয়েন্ট সূচকের দরপতনে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দরপতন হয়েছে।

ফলে এক মাসের বেশি সময় ধরে থেমে থেমে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক পতনের পরিপ্রেক্ষিতে, এখন তা হতাশ বিনিয়োগকারীদের জন্য লোকসান কমানোর এবং নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দেওয়ার ইঙ্গিতও দিচ্ছে। শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার ফলে বাজারটি এখন অবমূল্যায়িত হয়ে পড়েছে এবং এর ফলে পুঁজিবাজারে একটি অদ্ভুত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে বাজারের মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) ১০ এর নিচে অবস্থান করছে, যা একটি ঐতিহাসিক সংকেত দিচ্ছে।

এই পতনশীল পরিসংখ্যান নির্দেশ করে যে, পুঁজিবাজারে ঝুঁকি এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, ফলে এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় এবং গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। এর মানে হচ্ছে, এটি এমন একটি সময়, যখন পুঁজিবাজারের দুর্বলতা আসলে তার শক্তির মধ্যে পরিণত হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এখন কম দামে উচ্চ সম্ভাবনা খুঁজে পাচ্ছেন। যেখানে সুচিন্তিত বিনিয়োগ দীর্ঘ মেয়াদে লোভনীয় মুনাফা নিশ্চিত করতে পারে।
একটি কোম্পানির পিই রেশিও নির্ধারিত হয় তার শেয়ারের বাজারমূল্য এবং শেয়ারপ্রতি আয়ের (ইপিএস) ভিত্তিতে।

উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের শেষে যদি একটি কোম্পানির ইপিএস হয় ১০ টাকা এবং শেয়ারের বাজারমূল্য হয় ২০০ টাকা, তবে ওই বছরে কোম্পানির পিই রেশিও হবে ২০। অর্থাৎ, শেয়ারপ্রতি আয়কে শেয়ারের বাজারমূল্য দিয়ে ভাগ করলে যে ফলাফল আসে, সেটি কোম্পানির পিই রেশিও হিসেবে গণ্য হয়।

পিই রেশিও ২০-এর মানে হলো, যদি কোম্পানির অন্যান্য পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকে এবং আয় বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে বিনিয়োগকারী ২০ বছরে তাঁর পুরো বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাবেন। একইভাবে, পুরো বাজারের পিই রেশিও এভাবে নির্ধারিত হয়।

বাজার বিশ্লেষকেরা বলেন, একটি কোম্পানির পিই রেশিও যত কম, তত বেশি লাভজনক হতে পারে, কারণ কম পিই রেশিও মানে শেয়ার কম দামে পাওয়া যাচ্ছে, যা বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। তবে, পিই রেশিও ২০ বা তার বেশি হলে তা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, কারণ এটি অতিরিক্ত মূল্যায়নের ইঙ্গিত দেয়। কিছু ক্ষেত্রে বন্ধ কোম্পানির পিই রেশিও কম থাকতে পারে, যা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তাই, পিই রেশিওর পাশাপাশি কোম্পানির অন্যান্য মৌলিক বিষয়ও বিচার করা প্রয়োজন।

দেশের পুঁজিবাজারে শেয়ারদর বর্তমানে চরম নিম্নমুখী, ফলে বেশির ভাগ শেয়ারই অতিরিক্ত মূল্যছাড়ে রয়েছে। এটি একদিকে মন্দার সংকেত, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনাময় সুযোগ সৃষ্টি করেছে। শেয়ারদরের পতন ও অবমূল্যায়নের কারণে বেশির ভাগ শেয়ার এখন ঝুঁকিমুক্ত বলে মনে হচ্ছে, কারণ বাজার স্বাভাবিক মূল্যায়নে ফিরে আসতে পারে। তাই বিনিয়োগকারীরা সঠিক বিশ্লেষণ করে লাভজনক সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) তথ্যমতে, এতে বিদায়ী সপ্তাহে সার্বিক মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) কমেছে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। ডিএসইর তথ্য বলছে, বিদায়ী সপ্তাহের শুরুতে ডিএসইর পিই রেশিও ছিল ১০ দশমিক ১৫ পয়েন্টে, যা সপ্তাহ শেষে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৮৩ পয়েন্টে। ফলে সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইর পিই রেশিও দশমিক ৩২ পয়েন্ট বা ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ কমেছে।

চলতি বছরে জুলাই আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের তুলনায় পিই রেশিও কমে গেছে, যা বাজারের ঝুঁকিহ্রাসের ইঙ্গিত দেয়। ৯ আগস্ট পিই রেশিও ছিল ১০ দশমিক ৫১, যা ১৩ সেপ্টেম্বরে বেড়ে ১০ দশমিক ৭৩ হয়েছিল। জুলাই মাসের শেষের দিক ও আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় ১৬ অক্টোবরের পিই রেশি ৯ দশমিক ৮৩ এ চলে আসে।

আমার স্টক সূত্র মতে, এ সময় সিরামিকস খাতে পিই রেশিও ৪৯.৬, কাগজ ও প্রকাশনা খাতের পিই রেশিও ২৭.১, চামড়া খাতের পিই রেশিও ২৬.১, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের পিই রেশিও ১৯.৬, ভ্রমন খাতের পিই রেশিও ১৭, আইটি খাতের পিই রেশিও ১৫.৬, বিবিধ খাতের পিইও রেশি ১৫.৪, টেলিযোগাযোগ খাতের পিই রেশিও ১৪.৩,

বীমা খাতের পিই রেশিও ১৪.১, সিমেন্ট খাতের পিই রেশিও ১২.৭, সেবা ও আবাসন খাতের পিই রেশিও ১০.৮, আর্থিক খাতের পিই রেশিও ১০.৮, বস্ত্র খাতের পিই রেশিও ১০.৭, প্রকৌশল খাতের পিই রেশিও ১০.৫, ব্যাংক খাতের পিই রেশিও ৬.২ বিদ্যুও ও জ¦ালানী খাতের পিই রেশিও ৫.৩।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক শীর্ষ এক ব্রোকারেহ হাউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, পিই রেশিও কমলে বাজার বিনিয়োগবান্ধব হয়। দরপতনে শেয়ার দাম কমে যাওয়ায় ঝুঁকি কমেছে এবং বিনিয়োগকারীদের ভালো রিটার্ন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় কেউ বিনিয়োগ করলে লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে বিনিয়োগের এখন উত্তম সময়।