আলমগীর হোসেন ও শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: এক কার্যদিবস কিছুটা সূচকের ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর সপ্তাহের তৃতীয় কার্যািদবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ফের সূচকের কিছুটা পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। ফলে সরকার সহ নিয়ন্ত্রক সংস্থা নানা উদ্যোগ গ্রহণ করার পর পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরছে না। মাঝে মধ্যে বাজারে একটু ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার দেখা মিললেও পরক্ষণেই আবার দরপতন হচ্ছে। ফলে বড় লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা নেমে এসেছে।

দীর্ঘ পতন শেষে গত জুন থেকে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাস থেকে ফের পতনের ধারায় ফিরে যায়, যা গত কয়েক কার্যদিবসে নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে গত ৩২ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক ৬০৮ পয়েন্ট দরপতন হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা সংকট দেখা গেছে। এসময় অধিকাংশ শেয়ারের দাম ৩৫ থেকে ৪০ দরপতন হয়ে।ে তবে এর মাঝে মধ্যে দরপতন না হলেও সূচক তেমন একটা বাড়নি। ফলে পুঁজিবাজারে একটা সমস্যা কাটতে না কাটতেই হাজির হচ্ছে আরেক সমস্যা, যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হয় দরপতন।

ফলে গত জুনে শেয়ারদরের সঙ্গে লেনদেন বাড়তে দেখে অনেকে আকৃষ্ট হয়েছিলেন নতুন বিনিয়োগে। কিন্তু গত প্রায় দেড় মাসের দরপতনে তারা ক্ষতির মুখে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে বাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। চলতি দরপতনের জন্য রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্ট অস্থিরতার প্রভাবকে বড় করে দেখছেন অনেকে। এর সঙ্গে পুঁজিবাজার সংস্কার সংক্রান্ত কিছু ইস্যু নিয়েও অস্বস্তি আছে। বিশেষত মার্জিন ঋণ ইস্যু নিয়ে অস্বস্তি বেশি।

পাশাপাশি জুনে আর্থিক হিসাব শেষ হয় এমন কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার সময় ঘনিয়ে আসায় নেতিবাচক ধারার আশঙ্কায় কেউ কেউ শেয়ার বিক্রি করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নীতি নিয়েছেন। ফলে চাহিদা কমে উল্টো বিক্রির চাপ বেড়েছে। এছাড়া একটি গ্রুপ লেনদেনের শুরুতে কিছুটা সূচকের উত্থান ঘটালেও দিনশেষে নিজেরা নিজেদের মধ্যে শেয়ার ক্রয় বিক্রয় করে বাজারে পেনিক সেল সৃষ্টি করছে। ফলে দিনশেষে সূচকের বড় দরপতন ঘটছে। শীর্ষ কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজ থেকে পেনিক সেলের অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজার সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না।

একাধিক ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা জানান, মার্জিন ঋণ বিধিমালা সংশোধনে বিলম্ব করে দরপতনকে দীর্ঘায়িত করছে কমিশন। এটা দ্রুত শেষ করা দরকার। ধারণা করা হচ্ছে, সংশোধিত বিধিমালার কারণে বাজারে তারল্য প্রবাহ কমবে। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার মার্জিন ঋণের অযোগ্য হবে। ফলে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান নেওয়ার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ আছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারের লেনদেন বর্তমানে যে পর্যায়ে নেমেছে, তাতে বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কারও জন্যই তা আশান্বিত হওয়ার মতো না। এই লেনদেনে অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর পরিচালন খরচ তোলা দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। অনেক ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক মাস শেষে বাজার থেকে পরিচালন খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছে। একইভাবে লেনদেন থেকে স্টক এক্সচেঞ্জগুলো যে কমিশন আয় করে তা দিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালন খরচ উঠছে না।

বিএসইসি-এর পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, সংশোধিত মার্জিন ঋণ বিধিমালা চূড়ান্ত হওয়া নিয়ে পুঁজিবাজারে ছড়ানো নানা গুজবে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। নতুন বিধিমালার খসড়া প্রণয়নের সময় শেয়ারবাজারের সব অংশীজনের মতামত ও সুপারিশ বিবেচনা করা হয়েছে। এখন এটি চূড়ান্তকরণের পর্যায়ে রয়েছে। তিনি আরও আশ্বস্ত করেন, বিধিমালা অনুমোদিত হওয়ার পরেও বাজারের অংশীজনদের মানিয়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হবে। কোনো বিনিয়োগকারী বা ব্রোকারকে ঝুঁকির মুখে ফেলা হবে না।

কমিশনের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, নতুন বিধিমালাটি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যালোচনায় আছে। শেয়ারবাজারের টাস্কফোর্স ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছ থেকে মতামত সংগ্রহ শেষে এটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদনের পর বিধিমালা কার্যকর করতে ছয় মাস থেকে এক বছরের ট্রানজিশন সময় দেওয়া হতে পারে, যাতে বাজারে ধাক্কা না লাগে।

আবুল কালাম বলেন, একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে গুজব ছড়িয়ে বাজারে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। বিএসইসি বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও যোগ করেন, বিধিমালা প্রণয়নে অংশীজনদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যদিও টাস্কফোর্সের কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নযোগ্য না হওয়ায় বাদ দেওয়া হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক দিন ধরে পুঁজিবাজারে লেনদেনের শুরুতে সূচকের উত্থান দেখা গেলেও লেনদেন শেষে তা পতনে রূপ নেয়। সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে সকালে লেনদেনের শুরু থেকে ডিএসইএক্স সূচক কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও পরে তা নিম্নমুখী অবস্থানে চলে আসে। লেনদেন শেষ হওয়া পর্যন্ত সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা বিরাজ করে।

জানা গেছে, দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ২২.২৬ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৮৯ পয়েন্টে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৩.৯৭ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৭৭ পয়েন্টে এবং ডিএসই৩০ সূচক ৩.০৫ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৯৬৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
ডিএসইতে মোট ৩৯৩টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ারের দাম বেড়েছে ৮০টি কোম্পানির, কমেছে ২৪১টির এবং অপরিবর্তিত আছে ৭২টির। এ দিন ডিএসইতে মোট ৪৭৮ কোটি ১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৩৯৪ কোটি ৬৪ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।

অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সিএসসিএক্স সূচক আগের দিনের চেয়ে ১৩.২৫ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৮ হাজার ৮০৯ পয়েন্টে। সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ২০.০৫ পয়েন্ট বেড়ে ১৪ হাজার ৩০২ পয়েন্টে, শরিয়াহ সূচক ০.৮৫ পয়েন্ট বেড়ে ৮৯৭ পয়েন্টে এবং সিএসই ৩০ সূচক ৮১.৭৫ পয়েন্ট বেড়ে ১২ হাজার ৬১১ পয়েন্টে অবস্থান করছে।‎ সিএসইতে মোট ২০৫টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ৮৪টি কোম্পানির, কমেছে ৯২টির এবং অপরিবর্তিত আছে ২৯টির। সিএসইতে ১২ কোটি ২৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।