পুঁজিবাজারে ভালো শেয়ারেও বাজার মন্দা কাটছে না লেনদেন খরা
আলমগীর হোসেন ও শহীদুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজার টানা দরপতনে ফের লেনদেনের খরায় পড়েছে। লেনদেন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও টাকার পরিমাণ কমছে। সপ্তাহে একদিন কিছুটা উন্নতি হলে পরের চার কার্যদিবস টানা দরপতন হচ্ছে। এমন অবস্থা গত সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে শুরু হলেও এখনও তা অব্যাহত আছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম হতাশা নেমে এসেছে। ফলে সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) নামমাত্রা কিছুটা সূচকের উত্থান হলেও ডিএসইতে গত চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন লেনদেন হয়েছে।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনেক দিন ধরে পুঁজিবাজারে লেনদেনের শুরুতে সূচকের উত্থান দেখা গেলেও লেনদেন শেষে তা পতনে রূপ নেয়। তবে টানা পতনের রহস্য কী এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোন ভুমিকা নিতে পারছেন না। তেমনি সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে লেনদেনের শুরু থেকে ডিএসইএক্স সূচক কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও পরে তা নিম্নমুখী অবস্থানে চলে আসে। তবে, সূচকের সামান্য উত্থানের মধ্যে দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। যা গত কয়েক মাসের ব্যবধানে ডিএসইর লেনদেন অনেক কমেছে, যা চার মাস আগের অবস্থানে নেমে এসেছে।
একাধিক বিনিয়োগকারীর সাথে আলাপকালে বলেন, পুঁজিবাজারের টানা দরপতনে বিনিয়োগকারীরা আস্থা সংকটে ভুগছেন। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার হুটহাট সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পাচ্ছেন না। যখনই বাজার একটু ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে তখনই কোন না কোন গুজবে বাজারকে অস্থিতিশীল করে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোন ভুমিকা নিতে পারছেন না।
তেমনি গত কমিশনের আমলে অনেক দুর্বল কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যার অধিকাংশই এখন দেউলিয়ার পথে। আবার করোনা মহামারীতে সেইসব দুর্বল কোম্পানির শেয়ার দর কারসাজির মাধ্যমে এমন পর্যায়ে উঠেছে, যা শেষমেশ ফ্লোর প্রাইস দিয়ে আটকিয়েছে তৎকালীন কমিশন। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারী নিঃস্ব থেকে আরও নিঃস্ব হয়েছেন। অনেকে বাজার ছেড়ে চলে গেছেন। আর যারা আছেন, তারাও লোকসানে থাকতে থাকতে পুঁজি হারিয়ে ফেলছেন।
অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী কাজী হোসাইন আলী বলেন, পুঁজিবাজারের সাথে দু’যুগের বেশি জড়িত। এর মধ্যে ২০১০ সালের লোকসান এখনও কাটিয়ে উঠতে পারছি না। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন করে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে আবার বড় লোকসানের মুখে পড়ছি। এ অবস্থায় বিক্রি করলে ৩ লাখ টাকা হাতে পাব। বাজারের এমন চরিত্র থাকলে কী ভাবে নতুন বিনিয়োগকারীরা বাজারমুখী হবে।
এছাড়া গত ১৪ মাসে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন কমিশন ও নতুন নেতৃত্ব এলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরেনি। যারা ১৪ মাস আগে ১০০ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন, আজ তারা নিজেদের অর্থ মাত্র ৫০ টাকায় দেখতে পাচ্ছেন। এ যেন এমন সময়, যখন দেশ হাসছে, বিনিয়োগকারী কাঁদছে।
একাধিক সিকিউরিটিজ হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, পুঁজিবাজারের লেনদেন বর্তমানে যে পর্যায়ে নেমেছে, তাতে বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কারও জন্যই তা আশান্বিত হওয়ার মতো না।
এই লেনদেনে অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর পরিচালন খরচ তোলা দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। অনেক ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক মাস শেষে বাজার থেকে পরিচালন খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছে। একইভাবে লেনদেন থেকে স্টক এক্সচেঞ্জগুলো যে কমিশন আয় করে তা দিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালন খরচ উঠছে না।
ডিএসই ও সিএসই সূত্রে জানা গেছে, দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৫.৩৬ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৩৬৭ পয়েন্টে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক ০.৫৭ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৭৭ পয়েন্টে এবং ডিএস৩০ সূচক ৫.২৯ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৯৭৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
ডিএসইতে মোট ৩৯৭টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ারের দাম বেড়েছে ১৪৫টি কোম্পানির, কমেছে ১৭৮টির এবং অপরিবর্তিত আছে ৭৪টির। এ দিন ডিএসইতে মোট ৪৭৮ কোটি ১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৩৫৫ কোটি ৪ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।
সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের উত্থানের মধ্যে দিয়ে লেনদেন শেষ হলেও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) কমেছে।
এদিন সিএসই সিএসসিএক্স সূচক আগের দিনের চেয়ে ৮.০৬ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৮ হাজার ৮০১ পয়েন্টে। সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৩.৫২ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ২৮৯ পয়েন্টে, শরিয়াহ সূচক ০.৪৭ পয়েন্ট বেড়ে ৮৯৭ পয়েন্টে এবং সিএসই ৩০ সূচক ২৩.১৩ পয়েন্ট কমে ১২ হাজার ৬৩৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
সিএসইতে মোট ১৮৩টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ৭২টি কোম্পানির, কমেছে ৯৩টির এবং অপরিবর্তিত আছে ১৮টির। সিএসইতে ১২ কোটি ২৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১২ কোটি ২৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।



