সপ্তাহজুড়ে পুঁজিবাজারে বাজার মূলধন উধাও ১১ হাজার ১০ কোটি টাকা
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিললেও পুঁজিবাজার হাঁটছে উল্টো পথে। ফলে কিছুতেই থামছে না দরপতন, বরং ক্রমেই পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি আরও নাজুক হচ্ছে। যেখানে সরকার সহ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাজার স্থিতিশীল রাখতে কাজ করছে। সেখানে টানা দরপতনের কারণ কী। এদিকে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও ব্যতিক্রম শুধু পুঁজিবাজার।
গত ১৪ মাসে পুঁজিবাজারের বৃদ্ধি তো দূরের কথা, উল্টো প্রতিদিনই কমছে মূল্যসূচক ও বাজার মূলধন। ফলে টানা দরপতনে বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাঝে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বারবার আস্থার সংকট, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোন অবদান রাখতে পারছে না পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীরা মনে করে বিএসইসির অদক্ষ্য ও অযোগ্য কমিশনের কারণে বেহাল দশা দেশের পুঁজিবাজারের।
এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল না করে বাজার সংস্কারের নামে অস্থিতিশীল করছেন। ফলে ক্রমান্বয়ে পুঁজিবাজার ডুবতে বসেছে। স্পর্শকাতর এই খাতটির সঙ্গে লাখ লাখ বিনিয়োগকারীদের সরাসরি বিনিয়োগ জড়িত, প্রতিদিনের লেনেদেনের প্রতিফলন ঘটে সূচক উঠা-নামার মাধ্যমে, ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়াটিও সূচকের সমান্তরাল রেখায় প্রতিফলিত হয়। সূচক ও লেনদেন তলানিতে নামছে, যেন দেখার কেউ নেই।
ফলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনের ওপর আস্থা পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। গত বছরের ১৮ আগস্ট চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক কমেছে ৬৬৩ পয়েন্ট। মুলত রাশেদ মাকসুদ কমিশন যখন দায়িত্ব নেয় তখন ডিএসই সূচক ছিলো ৫৭৭৮.৬৩ পয়েন্ট। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে সোমবার ডিএসইর সূচক এসে দাঁড়িয়েছে ৫১২২.২২পয়েন্ট।
এদিকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে পুরো অক্টোবর মাস জুড়ে মোটেও ভালো যায়নি পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য। ফলে গত দেড় মাস পতনের মধ্যে ছিল পুঁজিবাজার। ফলে বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এ অবস্থায় পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তবে দীর্ঘ পতনের পর চলতি মাস থেকে পুঁজিবাজার ও লেনদেন ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে সপ্তাহজুড়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় পতনে লেনদেন হয়েছে। এ সময়ে ডিএসই ও সিএসইতে টাকার পরিমাণে লেনদেন কিছুটা বেড়েছে। ফলে বিদায়ী সপ্তাহে উভয় পুঁজিবাজারে বাজার মূলধন কমেছে ১১ হাজার ১০ কোটি ২০ লাখ টাকা। ডিএসই ও সিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। আর বিদায়ী সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৬ লাখ ৯৯ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইতে বাজার মূলধন ৫ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা বা দশমিক ৮২ শতাংশ কমেছে। সপ্তাহটিতে টাকার পরিমাণে লেনদেন ১৪৮ কোটি ১৫ লাখ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকায়। আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ২ হাজার ১৩৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
সপ্তাহটিতে ডিএসইর প্রধান সূচক ২৭ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১২২ পয়েন্টে। অপর সূচকগুলোর মধ্যে শরিয়াহ সূচক ৫ পয়েন্ট এবং ডিএসই ৩০ সূচক ১০ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৮২ পয়েন্টে এবং ১ হাজার ৯৮৭ পয়েন্টে। সপ্তাহটিতে ডিএসইতে ৩৯২ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১৭৭ টির , দর কমেছে ৩৬ টির এবং ১৭৯ টির শেয়ার দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) বিদায়ী সপ্তাহে সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১২৭.৩৩ পয়েন্ট বা ০.৮৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ২৮৬ পয়েন্টে। সিএসইর অপর সূচকগুলোর মধ্যে সিএসই-৩০ সূচক ০.৫৯ শতাংশ কমে ১২ হাজার ৬৫১ পয়েন্টে, সিএসসিএক্স সূচক ০.৭৭ শতাংশ কমে ৮ হাজার ৮১৩ পয়েন্টে, সিএসআই সূচক ০.৯৮ শতাংশ কমে ৮৯৮ পয়েন্টে এবং এসইএসএমইএক্স (এসএমই ইনডেক্স) ২.৮০ শতাংশ কমে ১ হাজার ৯৪৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
বিদায়ী সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৭০৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। আর বিদায়ী সপ্তাহের আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে সিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ৩ হাজার ৯১৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। টাকায়। সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন কমেছে ৫ হাজার ২১৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
বিদায়ী সপ্তাহে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হয়েছে ৯৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা। আর বিদায়ী সপ্তাহের আগের সপ্তাহে লেনদেন হয়েছিল ৬৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে সিএসইতে লেনদেন বেড়েছে ৩০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। বিদায়ী সপ্তাহে সিএসইতে মোট ৩০৬টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেনে অংশ নিয়েছে। কোম্পানিগুলোর মধ্যে দর বেড়েছে ১১৫টির, দর কমেছে ১৭০টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২১টির শেয়ার ও ইউনিট দর।



