আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: টানা দরপতনের বৃত্তে আটকে গেছে দেশের পুঁজিবাজার। সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় দরপতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। মুলত টানা দরপতনের সঙ্গে লেনদেন খরা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন লেনদেনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমছে। অব্যাহত পতনের মধ্যে পড়ে মূল্যসূচক চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে চলে এসেছে। আর লেনদেন কমতে কমতে ৩০০ কোটি টাকার ঘরে নেমেছে।

ফলে বলতে গেলে পুঁজিবাজারটি একেবারেই সরকারের মনোযোগের বাইরে। দীর্ঘদিনের জঞ্জাল সরিয়ে একটি স্থিতিশীল ও আস্থার বাজারে পরিণত করার আন্তরিক প্রচেষ্টা অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দেখা যায়নি। এছাড়া বিনিয়োগকারীরা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের হস্তক্ষোপ কামনা করছেন। তাছাড়া টানা দরপতনে প্রতিদিনই লেনদেন ও সূচক কমেছে। ফলে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চিত পুঁজিবাজারে সূচকের ‘কফিনে আরেকটি পেড়েক’ বসল। এদিন সূচকের পতন হয়েছে ৩৯ পয়েন্ট। টানা দরপতনে বিনিয়োগকারীরা ফোর্স সেল আতঙ্কে ভুগছেন। এমনকি কিছু কিছু ব্রোকারেজ হাউজ ফোর্স সেল শুরু করছেন।

তবে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও ব্যতিক্রম শুধু পুঁজিবাজার। প্রশ্ন উঠছে সব খাতে সংস্কারের পর ঘুরে দাঁড়ালেও পুঁজিবাজার কেন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না এ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। এছাড়া গত ১৪ মাসে পুঁজিবাজারের বৃদ্ধি তো দূরের কথা, উল্টো প্রতিদিনই কমছে মূল্যসূচক ও বাজার মূলধন।

ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিললেও পুঁজিবাজার চলছে সেই পুরানো উল্টো পথে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৪ মাস পুঁজিবাজারের কোন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বারবার আস্থার সংকট, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এছাড়া দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোন অবদান রাখতে পারছে না পুঁজিবাজার। তেমনি বিএসইসির অদক্ষ্য ও অযোগ্য কমিশনের কারণে বেহাল দশা দেশের পুঁজিবাজারের। সার্বিকভাবে বর্তমানে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে ভাটা চলছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফা কমছে। নতুন করে কোনো কোম্পানির তালিকাভুক্তি হচ্ছে না।

এছাড়া পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণও কমছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার নিয়ে আশাবাদী হতে পারছেন না। তাছাড়া টানা দরপতনের ডিএসইতে চার মাসের মধ্যে সূচক ৪৮৬০ পয়েন্টের নিচে নেমে গেছে। অন্য পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। এতে কমেছে সবকটি মূল্যসূচক। ডিএসই ও সিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি সপ্তাহে দুই কার্যদিবসের মধ্যে দুই কার্যদিবস সূচকের বড় দরপতন হয়। এর আগে গত সপ্তাহে টানা পাঁচ কার্যদিবস দরপতনের মধ্যে দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। মুলত পুঁজিবাজারে পরিকল্পিত ভাবে দরপতনের নেপথ্যে রয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এরা সেল প্রেসার দিয়ে বাজারকে অস্থিতিশীল করছে। এছাড়া মার্জিন লোন ইস্যুতে সেল প্রেসার বাড়ছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তবে সব কিছু যেনও নিরব আচরন করছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

ফলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনের ওপর আস্থা পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। গত বছরের ১৮ আগস্ট চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক কমেছে ৯২২ পয়েন্ট। মুলত রাশেদ মাকসুদ কমিশন যখন দায়িত্ব নেয় তখন ডিএসই সূচক ছিলো ৪৮৬০. ১৯ পয়েন্ট।

অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারী কাজী হোসাইন আলী বলেন, এটা পুঁজিবাজার নয় এটা লুটের বাজার। ১৫ বছর ধৈর্য্য ধরে ও একটি স্থিতিশীল বাজার পায়নি। গত ১৫ বছরে পুঁজিবাজারের যে ক্ষতি হয়নি তা অন্তবর্তীকালীন সরকারের ১৫ মাসে এরচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের পুঁজি শেষ আমাদের বাঁচান। এছাড়া আতঙ্কে বিনিয়োগকারীরা লোকসান কমাতে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাতে একদিকে কমেছে শেয়ারের দাম অন্যদিকে লেনদেনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক শীর্ষ এক ব্রোকারেজ হাউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, পুঁজিবাজারে টানা দরপতনে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করছেন। বর্তমানে পুঁজিবাজারে যে পরিমাণ শেয়ার বিক্রির কার্যাদেশ আসছে, সে তুলনায় ক্রয়াদেশের পরিমাণ কম। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সূচক ও লেনদেনে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও এগিয়ে আসছে না।

পুঁজিবাজারের মূল সমস্যা কোথায় সেটি নিয়ন্ত্রক এখনো চিহ্নিত করতে পারিনি। এর মধ্যে একের পর এক হুটহাট সিদ্ধান্তে বাজার অস্থিতিশীল হচ্ছে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোন ভুমিকা নিচ্ছে না। তবে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও নীতি নির্ধারক যারা রয়েছেন তাদেরকে বাজারের মূল সমস্যাগুলো খুঁজে বের করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। তাছাড়া পুঁজিবাজার ধ্বংস হয়ে যাবে।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে ডিএসইর এক পরিচালক বলেন, পুঁজিবাজারে ছোট, মাঝারি ও বড় সব শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একধরনের হতাশা ভর করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে কেউ বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। উল্টো অনেকে লোকসান মেনে নিয়ে শেয়ার বিক্রি করে নিস্কিয় হয়ে পড়ছেন। সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দিক থেকে বাজারের পতন থামাতে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় বিনিয়োগকারীদের হতাশা আরও বাড়ছে। পুঁজিবাজার ইস্যুতে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।

জানা গেছে, সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন সূচকের সাথে কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর ও টাকার পরিমাণে লেনদেন। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৩৯ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৪ হাজার ৮৬০ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১১ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ১০ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ১৮ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৯১০ পয়েন্টে।

দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৮৬ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৭০ টির, দর কমেছে ২৭৫ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৪১ টির। ডিএসইতে ৩৫৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৪৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৪০২ কোটি ২০ লাখ টাকার ।

অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৪০ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৭৪৩ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৭৩ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৩৭ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১২৭ টির এবং ৯ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।