আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনের ওপর আস্থা পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। ফলে দিন যতই যাচ্ছে পুঁজিবাজারের অবস্থা ততই ভয়াবহ খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা কী ভাবে পুঁজি টিকিয়ে রাখবেন তা নিয়ে হা হুতাশ বাড়ছে। গত দুই মাসের ব্যবধানে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীদের মূলধন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পুঁজি হারিয়েছে।

ফলে কোন ক্রমেই দরপতনের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না পুঁজিবাজার। একই সঙ্গে কাটছে না লেনদেনের খরা। কমছে লেনদেন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও টাকার পরিমাণ। পরিস্থিতি এমন হয়েছে, এক সময়ের দৈনিক তিন হাজার কোটি টাকার লেনদেনের বাজার, এখন ২০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

মুলত পুঁজিবাজার ইস্যুতে বিএসইসি চেয়ারম্যানের হুটহাট সিদ্ধান্ত ও মার্জিন ইস্যুতে হঠকারী সিদ্ধান্ত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরের পুঁজিবাজার তালিকাভুক্ত পাঁচ ব্যাংক ইস্যুতে বির্তকিত সিদ্ধান্তের ফলে আস্থা সংকটে বাজারবিমুখ হয়ে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া বিনিয়োগকারীরা লোকসানে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন। তবে বাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখাই প্রধান দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কিন্তু কমিশন ঘুমিয়ে আছে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখার কোনো দায় নেই বিএসইসির।

মুলত ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও ব্যতিক্রম শুধু পুঁজিবাজার। গত ১৪ মাসে পুঁজিবাজারের বৃদ্ধি তো দূরের কথা, উল্টো প্রতিদিনই কমছে মূল্যসূচক ও বাজার মূলধন। ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিললেও পুঁজিবাজার চলছে সেই পুরানো উল্টো পথে।

ফলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৪ মাস পুঁজিবাজারের কোন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বারবার আস্থার সংকট, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোন অবদান রাখতে পারছে না পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীরা মনে করে বিএসইসির অদক্ষ্য ও অযোগ্য কমিশনের কারণে বেহাল দশা দেশের পুঁজিবাজারের।

এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল না করে সংস্কারের নামে একের এক এক কির্তকিত সিদ্ধান্তে বাজারকে অস্থিতিশীল করছেন। ফলে ক্রমান্বয়ে পুঁজিবাজার ডুবতে বসেছে। স্পর্শকাতর এই খাতটির সঙ্গে লাখ লাখ বিনিয়োগকারীদের সরাসরি বিনিয়োগ জড়িত, প্রতিদিনের লেনেদেনের প্রতিফলন ঘটে সূচক উঠা-নামার মাধ্যমে, ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়াটিও সূচকের সমান্তরাল রেখায় প্রতিফলিত হয়। সূচক ও লেনদেন তলানিতে নামছে, যেন দেখার কেউ নেই।

এদিকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনের ওপর আস্থা নেই বিনিয়োগকারীদের। গত বছরের ১৮ আগস্ট চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক কমেছে ১০৭৬ পয়েন্ট। মুলত রাশেদ মাকসুদ কমিশন যখন দায়িত্ব নেয় তখন ডিএসই সূচক ছিলো ৫৭৭৮.৬৩ পয়েন্ট। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর সূচক এসে দাঁড়িয়েছে ৪৭০২.৬৮ পয়েন্ট। আর দৈনিক লেনদেনের ধীর গতিতে সন্তুষ্ট হতে পারছে না বিনিয়োগকারীরা।

এছাড়া কমিশন সংক্রান্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে বিনিয়োগকারীদের মনে তৈরি করেছে বড় আস্থার সংকট। মুলত নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মার্জিন ঋণ বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। এ নতুন বিধিমালা নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন বিনিয়োগকারীরা। এ কারণে পুঁজিবাজারে বড় পতন ঘটেছে। এতে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

একাধিক বিনিয়োগকারীর সাথে আলাপকালে বলছেন, ২০১০ সালের চেয়ে বর্তমান পুঁজিবাজারের অবস্থা ভয়াবহ। মুলত ২০১০ সালের চেয়ে এবার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা। তাছাড়া অব্যাহত পতনের মধ্যেই পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারশূন্য ঘোষণার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে। ফলে বাজারের পতনের ধারা আরও নিম্নমুখী হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, বাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখাই প্রধান দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কিন্তু কমিশন ঘুমিয়ে আছে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখার কোনো দায় নেই বিএসইসির। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে এখন নতুন করে কোনো আশা দেখছেন না সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এ কারণে প্রতিদিনই কোনো না কোনো বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়ে যাচ্ছেন।

ইব্রাহীম হোসেন নামের এক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বলেন, আমাদের শেয়ারের মূল্য শূন্য করে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক, কিন্তু বিএসইসি বোবা হয়ে বসে আছে। গত সপ্তাহে একীভূত প্রক্রিয়ায় থাকা শরিয়াভিত্তিক পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এর প্রভাবে গত সপ্তাহে পুঁজিবাজারে ছিল নেতিবাচক। লেনদেনে প্রধান মূল্যসূচক ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ৪ হাজার ৭০২ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এক সময় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ৩ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। সেটি কমতে কমতে ২০০ কোটির ঘরে নেমেছে।