অন্তর্বর্তী সরকারের ১৬ মাসে আইপিওশূন্য পুঁজিবাজার
আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: টানা দরপতনে অস্থির দেশের পুঁজিবাজার। একদিকে টানা পতন অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওকে বিবেচনা করা হয় পুঁজিবাজারের ‘নতুন রক্ত’ হিসেবে। অথচ দেশের পুঁজিবাজারে এই নতুন রক্তপ্রবাহ বা আইপিও আসা বন্ধ হয়ে গেছে। বিদায়ের পথে থাকা ২০২৫ সালে একটিও আইপিও আসেনি।
ফলে গত ১৬ মাসে দেশের পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। এমনকি এই সময় কোনো কোম্পানি আইপিও আবেদনও জমা দেয়নি। সরকারি মালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ার দ্রুত বাজারে আনার নির্দেশ থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বাজার সংশ্লিষ্টরা করোনার সময় ছাড়া এত দীর্ঘ সময় আইপিও না হওয়ার ঘটনাকে ‘নজিরবিহীন’ মনে করছেন।
নতুন আইপিও এলে পুঁজিবাজারে বিকল্প বিনিয়োগের পথ সৃষ্টি হয় এবং তারল্য বাড়ে। অতীতে যখনই বাজারে ভালো কোম্পানির আইপিও এসেছে, তখনই নতুন বিনিয়োগকারী এসেছেন এবং বাজারে তারল্য বেড়েছে। তাই বাজারে গতি ফেরাতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) নতুন ভালো কোম্পানির আইপিও আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি দীর্ঘদিন আইপিও বন্ধ থাকে, তাহেল বিনিয়োগের বিকল্প পথ যেমন খুলবে না, তেমনই বিনিয়োগকারীদের আস্থাও নষ্ট হয়ে যাবে।
দেশের পুঁজিবাজারে সর্বশেষ আইপিও এসেছে টেকনো ড্রাগসের। গত বছরের (২০২৪ সালের) জুনে এই কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে টাকা উত্তোলন করে। এরপর আর কোনো কোম্পানির আইপিও আসেনি। অর্থাৎ দেড় বছর ধরে পুঁজিবাজারে আইপিও আসা বন্ধ রয়েছে। দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় আইপিও না আসার ঘটনা আর ঘটেনি। এমনকি একটি পুরো বছরে কোনো আইপিও না আসার ঘটনাও এটিই প্রথম।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়। একই সময়ে পুনর্গঠিত হয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। পুঁজিবাজার সংস্কারে ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর পাঁচ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে বিএসইসি। ১৭টি কার্যপরিধি নির্ধারণের পাশাপাশি আইপিও বিধিমালা, ২০১৫ পরিবর্তন করে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয় টাস্কফোর্স।
বর্তমানে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইক্যুয়িটি সিকিউরিটিজ) বিধিমালা, ২০২৫ নামে নতুন বিধিমালা জনমত যাচাই শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদনের পর এটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন বিধিমালার কারণে এই সময় পুঁজিবাজারে কোনো নতুন আবেদন জমা হয়নি। যদিও আইপিও আবেদন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। কিছু আবেদন থাকলেও অসংগতির কারণে সেগুলো বাতিল হয়েছে। ফলে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্তির জন্য এগোয়নি।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধীনে ২০২০ ও ২০২১ সালে পরপর দুই বছর শেয়ারবাজার থেকে আইপিওর মাধ্যমে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ উত্তোলন হয়। তবে ২০২২ সালে আইপিওর সংখ্যা কমে আসে। পরের বছর ২০২৩ সালে আইপিওতে রীতিমতো ধস নামে, যা অব্যাহত থাকে ২০২৪ সালেও।
২০২৪ সালে আইপিওতে শেয়ার বিক্রি করে মাত্র চারটি কোম্পানি অর্থ উত্তোলন করে। এর মধ্যে ছিল এনআরবি ব্যাংক, বেস্ট হোল্ডিং, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ এবং টেকনো ড্রাগস। এই চার কোম্পানির মধ্যে এনআরবি ব্যাংক স্থির মূল্য পদ্ধতিতে আইপিওতে শেয়ার বিক্রি করে। বাকি তিন কোম্পানি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে আসে।
এনআরবি ব্যাংক আইপিওতে শেয়ার ছেড়ে উত্তোলন করে ১০০ কোটি টাকা। বাকি তিন কোম্পানির মধ্যে বেস্ট হোল্ডিং ৩৫০ কোটি টাকা, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ৯৫ কোটি টাকা এবং টেকনো ড্রাগস ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করে। অর্থাৎ চারটি কোম্পানি আইপিওতে শেয়ার ছেড়ে মোট ৬৪৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে। এর আগে ২০২৩ সালে মিডল্যান্ড ব্যাংক, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, শিকদার ইন্স্যুরেন্স এবং ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক গ্রোথ ফান্ড আইপিওতে আসে।
অর্থাৎ ২০২৩ সালে আইপিওতে আসে তিনটি কোম্পানি এবং একটি মিউচুয়াল ফান্ড। এর মধ্যে মিডল্যান্ড ব্যাংক ৭০ কোটি টাকা, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ১৬ কোটি টাকা, শিকদার ইন্স্যুরেন্স ১৬ কোটি টাকা এবং ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক গ্রোথ ফান্ড ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করে। অর্থাৎ চারটি প্রতিষ্ঠানের উত্তোলন করা অর্থের পরিমাণ ছিল ২০২ কোটি টাকা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও বলেন, আইপিও ছাড়া কোনো পুঁজিবাজার হতে পারে না। আইপিওর মাধ্যমে জনগণকে অফার করা হয়। একটি ভালো আইপিও এলে তার সঙ্গে সঙ্গে অনেক বিনিয়োগকারী আসেন। খারাপ আইপিও এলে কিন্তু বিনিয়োগকারী আসে না। যখন গ্রামীণফোন, ওয়ালটন, স্কয়ার ফার্মা, রবি এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আইপিও এসেছে তখন বাজারে অনেক বিনিয়োগকারী এসেছেন। যতবার বাজারে ভালো কোম্পানির আইপিও এসেছে, ততবার বাজারে নতুন নতুন বিনিয়োগকারী এসেছেন।
তিনি আরও বলেন, এখন আমরা যদি মনে করি, রাতারাতি কিছু হয়ে যাবে, তা নয়। এতকিছুর মধ্যেও বাজারে ভালো দিক হলো সুশাসন তৈরি হচ্ছে, আইন-কানুনের যে গ্যাপ ছিল সেগুলো ঠিক হচ্ছে। এখানে (শেয়ারবাজারে) এলে অযাচিতভাবে টাকা লোকসান করতে হবে না, মানুষের মধ্যে এই আস্থা তৈরি করতে পারলে এবং কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে, যে ক্ষতি বাজারে হয়ে গেছে তা ধাপে ধাপে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, আইপিও হলো পুঁজিবাজারের নিউ ব্লাড (নতুন রক্ত)। নিউ ব্লাড প্রবাহ যদি বাজারে বন্ধ হয়, তাহলে এটা দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাপক ক্ষতি করে। নতুন ভালো কোম্পানির আইপিও এলে বাজারে যেমন নতুন বিনিয়োগকারী আসেন, তেমনই বাজারে তারল্য বাড়ে। বিনিয়োগকারীদের বিকল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়, বাজারের গভীরতা বাড়ে। নতুন কোম্পানির আইপিও আনা উদ্যোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিতে হবে। কেন আইপিও আসছে না, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে খুঁজে বের করতে হবে এবং তার আলোকে কাজ করতে হবে।
পরপর দুই বছর মাত্র চারটি করে প্রতিষ্ঠান আইপিওতে এলেও ২০২২ সালে ছয়টি প্রতিষ্ঠান আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করে। এই ছয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ উত্তোলনের পরিমাণ ছিল ৬২৬ কোটি ২৬ লাখ ৯ হাজার টাকা। তার আগে ২০২১ সালে আইপিওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৫টি। এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থ উত্তোলনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮৫৮ কোটি ৪৪ লাখ ৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে বেক্সিমকো গ্রিন সুকুকই উত্তোলন করে ৪২৫ কোটি ৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।



