শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে ও সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকার তিন ধাপের (স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি) সংস্কার বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রধান উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন ও গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে বাজার তদারকি এবং ‘সবুজ বন্ড’ ও সুকুকের মতো নতুন আর্থিক উপকরণ চালুর উদ্যোগ।

এ ছাড়া পুঁজিবাজার কারসাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, পুঁজিবাজার সংক্রান্ত শিক্ষার প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব, নতুন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব।

পুঁজিবাজারের সংস্কার নিয়ে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন শুধু আইন করে শেয়ারবাজার ঠিক করা সম্ভব নয়; বরং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, স্বচ্ছতা এবং ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির অন্তর্ভুক্তিই হতে পারে টেকসই সংস্কারের মূল চাবিকাঠি। তিনি বলেন, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) জন্য পৃথক প্ল্যাটফর্মকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ ছাড়া ইকুইটি মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কর্পোরেট বন্ড, সুকুক, এবং গ্রিন বন্ডের মতো বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্বরোপ করতে হবে।

বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে ‘ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড অ্যাক্ট, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগের কথাও তিনি জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে দাবিহীন ডিভিডেন্ড বা শেয়ারগুলো সুরক্ষিত থাকবে এবং বিনিয়োগকারীরা তা ফেরত পাবেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, বাজারের প্রধান সমস্যা হলো আস্থার সংকট। এটি কাটানোর জন্য বিএসইসি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্য হলো বাজারে স্বচ্ছ ও সুশাসন নিশ্চিত করা। বাজারের কারসাজি এবং ইনসাইডার ট্রেডিং রোধে তিনি আধুনিক প্রযুক্তির ওপর জোর দিয়েছেন।

২০২৬ সালের মধ্যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনার নিয়েছেন যা দ্রুত অনিয়ম শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিজস্ব জনবল এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে (যেমন-বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও ডিএসই) কাজের সমন্বয় বা সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন জরুরি।

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ আবু আহামেদ বলেন বাজারকে স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করতে হলে শুধু অস্থায়ী পদক্ষেপ নয়, বরং গভীর ও টেকসই সংস্কার জরুরি। কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে বাজারে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় দুর্বলতা থাকলে কারসাজি ও অনিয়ম বেড়ে যায়, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির কারণ। মুলত শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি না থাকলে বাজার দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না।

অনেক দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়। বর্তমানে বাজারে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীর প্রাধান্য বেশি। ফলে বাজারে অস্থিরতা বাড়ে। ব্যাংক, বিমা কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মতো বড় বিনিয়োগকারী সক্রিয় হলে বাজার স্থিতিশীল হবে। অনেক বিনিয়োগকারী না বুঝেই বিনিয়োগ করেন, যা ঝুঁকি বাড়ায়। তাই বিনিয়োগ শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানো হলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট সেন্টিমেন্ট সার্ভে ২০২৬-তে দেখা যায়, ডিএসইএক্স সূচক ২০২৬ সাল শেষে ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার পয়েন্টে গিয়ে দাঁড়াবে। দৈনিক গড় লেনদেন ৪০০-৬০০ কোটি টাকার মধ্যে থাকার সম্ভাবনা বেশি। পুঁজিবাজারে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যাংক খাত সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে বলে মনে করছেন ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা। রাজনৈতিক ঝুঁকি (৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ) এবং সুশাসনের অভাবকে (২৩ দশমিক ৮ শতাংশ)

পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ আসার পথে প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
জরিপে অংশগ্রহণকারী ৬১ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা বিশ্বাস করেন, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছ ও সততা বাড়বে। ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন, বাজার কারসাজি ও জালিয়াতি হলো বর্তমান বাজারের সবচেয়ে বড় নৈতিক সমস্যা।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা (৩১ দশমিক ৭ শতাংশ) এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের (২৮ দশমিক ৭ শতাংশ) ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন উত্তরদাতারা। প্রায় ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ইটিএফ, গ্রিন বন্ড ও রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্টের মতো নতুন পণ্য বাজারে আসা অত্যন্ত জরুরি।

ফলে পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা দূর করতে এবং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে বাজারকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে একটি উচ্চপর্যায়ের সংস্কার কমিশন গঠনের পরিকল্পনা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। মূলত বাজারের কারসাজি রোধ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই কমিশনের মূল উদ্দেশ্য।
কমিশনের প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো বিগত বছরগুলোতে শেয়ারের দাম নিয়ে যেসব কারসাজি হয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা এবং দায়ীদের চিহ্নিত করা।

পুঁজিবাজারে বর্তমান আইন ও বিধিবিধানের আধুনিকায়ন করা যাতে কোনো লুপহোল (ফাঁকফোকর) ব্যবহার করে কেউ অনৈতিক সুবিধা না নিতে পারে। দুর্বল কোম্পানিগুলো কীভাবে বাজারে তালিকাভুক্ত হলো, তা খতিয়ে দেখা এবং ভবিষ্যতে আইপিও অনুমোদনের প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় একটি শক্তিশালী মেকানিজম তৈরি করা। গত কয়েক মাস ধরেই দেশের শেয়ারবাজারে তারল্যসংকট এবং বড় পতনের ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। বাজারের প্রতি এই আস্থার সংকট কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

বাজার বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কেবল সাময়িক ব্যবস্থা না নিয়ে বাজারের গভীর সমস্যার সমাধান করতে পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও পুনরায় এ দেশের বাজারে ফিরে আসবেন। কমিশন তাদের প্রাথমিক রিপোর্ট আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে পুঁজিবাজারের জন্য একটি ‘রোডম্যাপ’ তৈরি করা হবে, যা ভবিষ্যতে বাজারকে আরও গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করবে। দেশের পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল, স্থিতিশীল এবং বিনিয়োগবান্ধব করে গড়ে তুলতে ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি কার্যকর উৎস হিসেবে দেশের পুঁজিবাজারকে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কাজ করছে। এ লক্ষ্যে আইনি সংস্কার, নতুন আর্থিক পণ্য সংযোজন এবং বাজারে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বাজারের গভীরতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য মৌলভিত্তি শক্তিশালী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোকেও ধীরে ধীরে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারকে আরও আকর্ষণীয় করতে নতুন ধরনের আর্থিক পণ্য চালুর পরিকল্পনা, শক্তিশালী বন্ড মার্কেট গঠন, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ), ইসলামিক বন্ড বা সুকুক এবং গ্রিন বন্ড চালু করা।

পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বড় ধরনের আইনি সংস্কার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। ‘বিএসইসি আইন-২০২৫’ প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলেছে। পাশাপাশি ‘ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন-২০২৬’ এবং ‘হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা বিধিমালা-২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পুঁজিবাজারকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে সম্পূর্ণ ডিজিটাইজেশনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে বিনিয়োগকারীরা সহজে লেনদেনে অংশ নিতে পারেন। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে দেশে বিনিয়োগ সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।