দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও ২০২৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানি সিটি ব্যাংক তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেছে। ব্যাংকটির সমন্বিত নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ১১০ কোটি টাকা বা ৩১ শতাংশ বেশি। ব্যাংকটির একক নিট মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি এর চার সহযোগী প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে আরও ১৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা যোগ হয়েছে।

তবে সিটি ব্যাংকের চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬) নিট সুদজনিত আয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। তারপরেও ব্যাংকটির নিট মুনাফায় বড় উত্থান হয়েছে। যার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে রয়েছে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে বড় আয়। ব্যাংকটির আর্থিক হিসাব থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, সিটি ব্যাংকের ৩ মাসে শেয়ারপ্রতি ১.৫৮ টাকা করে নিট মুনাফা হয়েছে ২৪০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, যার পরিমাণ আগের বছরের একইসময়ে শেয়ারপ্রতি ০.৬১ টাকা করে নিট ৯২ কোটি ৮ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছিল। এ হিসাবে ব্যাংকটির মুনাফা বেড়েছে ১৪৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা বা ১৬২ শতাংশ।

মুনাফায় এই উত্থানের বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন বলেন, শক্তিশালী পারফরম্যান্সের পেছনে মূল চালিকা শক্তি ছিল মূল ব্যাংকিং আয়ের প্রবৃদ্ধি। পাশাপাশি, বিনিয়োগ আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয় মোট অপারেটিং আয়ের প্রায় ৩২ শতাংশ। মূলত উচ্চ মুনাফার সরকারি সিকিউরিটিজে কৌশলগত বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলেই এই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।

এছাড়াও, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এবং সম্পদের গুণগত মান উন্নতির ফলে প্রভিশনিংয়ের প্রয়োজনীয়তা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের সমপর্যায়ে রাখতে পারা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ থাকা সত্ত্বেও পরিচালন ব্যয় দক্ষতার সাথে নিয়ন্ত্রণে করে কস্ট-টু-ইনকাম অনুপাত ৪৪ শতাংশে নামিয়ে আনা ব্যাংকের এই সফলতা অর্জনে উল্লেখযোগ্য কারণ বলে জানান মাশরুর আরেফিন।

দেখা গেছে, ব্যাংকটির এসময় প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে সুদজনিত আয় বেড়েছে। তারপরেও নিট সুদজনিত আয় কমেছে। এর কারণ হিসেবে রয়েছে সুদজনিত আয় যে পরিমাণ বেড়েছে, তারচেয়ে বেশি আমানতকারীদের পেছনে ব্যয় বৃদ্ধি। এ ব্যাংকটির আগের বছরের প্রথম ৩ মাসে নিট সুদজনিত আয় হয়েছিল ১৫৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। তবে এ বছরের একইসময়ে কোম্পানিটির এই আয় কমে এসেছে ৬২ কোটি ৭৬ লাখ টাকায়।

তবে ব্যাংকটির আগের বছরের প্রথম ৩ মাসে বিনিয়োগ থেকে ৬০৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা আয় হলেও, সেটা এ বছরে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকায়। একইসঙ্গে ১৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকার কমিশন আয় বেড়ে এ বছরের প্রথম ৩ মাসে হয়েছে ২৫৩ কোটি ৪ লাখ টাকা। তবে ১২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার অপরিচালন আয় কমে এসেছে ৭ কোটি ৪২ লাখ টাকায়। ব্যবসায় উত্থানে থাকা ব্যাংকটির ব্যয়ও অনেকাংশে বেড়েছে।

দেখা গেছে, আগের বছরের ৩ মাসের ৫০৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার পরিচালন ব্যয় বেড়ে এ বছরের একইসময়ে হয়েছে ৫৯৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এ হিসাবে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ৮৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা বা ১৮ শতাংশ। ব্যাংকটির পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেতনাদিবাবদ খরচ হয়েছে। আগের বছরের প্রথম ৩ মাসের ২৯৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বেতনাদিবাবদ ব্যয় বেড়ে ২০২৬ সালের ৩ মাসে বেড়ে হয়েছে ৩৪৫ কোটি ৮ লাখ টাকায়।

অর্থাৎ ব্যাংকটির বেতনাদিবাবদ ব্যয় বেড়েছে ৪৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা বা ১৫ শতাংশ। ১ হাজার ৫২১ কোটি ২২ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের সিটি ব্যাংকে ২ হাজার ৫৮৭ কোটি ৫২ লাখ টাকার সংরক্ষিত মুনাফা (রিটেইন আর্নিংস) রয়েছে।

ব্যাংকটি থেকে গত ৩১ মার্চ প্রদত্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৭০১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এছাড়া সরকারি সিকিউরিটিজে ২২ হাজার ৪৯০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ও অন্যান্য খাতে ১ হাজার ৯৫৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। এর বিপরীতে ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের ১৬ হাজার ৩২৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকার কারেন্ট ডিপোজিট রয়েছে। এছাড়া ১২ হাজার ৫৭৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকার সেভিংস ডিপোজিট ও ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি ৭৯ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে।