বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: কম লভ্যাংশ দেওয়া এমনকি স্বল্প লভ্যাংশের কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রেও মার্জিন ঋণের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। একই সঙ্গে মার্জিন ঋণের জন্য ন্যূনতম বিনিয়োগ সীমা কমানো, ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো এবং একক কোম্পানিতে ঋণ এক্সপোজারের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা সংশোধনের খসড়া প্রকাশ করেছে বিএসইসি। খসড়ার ওপর অংশীজন ও সংশ্লিষ্টদের মতামত চাওয়া হয়েছে।

বিএসইসির মতে, এসব পরিবর্তন কার্যকর হলে পুঁজিবাজারে লেনদেন ও তারল্য বাড়তে পারে। তবে বাজার সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নীতিমালা অতিরিক্ত শিথিল হলে কম মানের কোম্পানিতে ঋণনির্ভর বিনিয়োগ বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।

মার্জিন ঋণ হলো ব্রোকারেজ হাউস বা মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে শেয়ার কেনার জন্য নেওয়া ঋণ। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারী নিজের অর্থের পাশাপাশি ঋণের অর্থ ব্যবহার করে বেশি পরিমাণ শেয়ার কিনতে পারেন। তবে এতে যেমন লাভের সম্ভাবনা বাড়ে, তেমনি বাজার প্রতিকূল হলে লোকসানের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, অন্তত ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া ‘বি’ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে মার্জিন ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এই শর্ত তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে ৫ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানির শেয়ারেও মার্জিন ঋণের সুযোগ তৈরি হবে।

খসড়ায় মার্জিন ঋণের জন্য ন্যূনতম বিনিয়োগ সীমা ৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে তুলনামূলক ছোট বিনিয়োগকারীরাও এই সুবিধার আওতায় আসতে পারবেন। এ ছাড়া বর্তমানে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক তাদের মূলধন বা নিট সম্পদের যেটি বেশি তার সর্বোচ্চ তিন গুণ পর্যন্ত মার্জিন ঋণ দিতে পারে। নতুন প্রস্তাবে এ সীমা বাড়িয়ে পাঁচ গুণ করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের মূলধন ১০০ টাকা হলে বর্তমানে তারা সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে; নতুন নিয়মে তা বেড়ে ৫০০ টাকা হতে পারে।

খসড়ায় মার্জিন ঋণের আওতায় আসার যোগ্য কোম্পানির ক্ষেত্রে ৫০ কোটি টাকার ন্যূনতম ফ্রি-ফ্লোট মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনের শর্ত তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে একক কোনো কোম্পানিতে মার্জিন ঋণের এক্সপোজার সীমা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। মার্জিন কলের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে কোনো বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিওর মূল্য ঋণের তুলনায় ৭৫ শতাংশে নেমে এলে মার্জিন কল দেওয়া হয়। নতুন প্রস্তাবে এ সীমা কমিয়ে ৭০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।

তবে বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রি বা ফোর্সড সেলের সীমা আগের মতো ৫০ শতাংশই রাখা হয়েছে। খসড়া সংশোধনীতে মার্জিন ঋণের জন্য যোগ্য কোম্পানি নির্ধারণের মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বেশির ভাগ কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রাইস-আর্নিং (পি/ই) অনুপাত ৩০-এর নিচে থাকতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে প্রাইস-টু-বুক (পি/বি) অনুপাত।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পি/বি অনুপাত ৩-এর বেশি এবং বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে ১-এর বেশি হলে তারা মার্জিন ঋণের জন্য যোগ্য হবে না। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, মার্জিন ঋণ সাধারণত শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তির কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশি উপযোগী। কারণ ঋণের অর্থ ব্যবহার করে বিনিয়োগ করলে বাজারে নেতিবাচক পরিস্থিতিতে ক্ষতির পরিমাণও বেড়ে যায়।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, খুব কম লভ্যাংশ দেওয়া বা দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিকে মার্জিন ঋণের আওতায় আনা উচিত নয়। কোম্পানির লভ্যাংশের হারকে মার্জিন ঋণের অনুপাত নির্ধারণের একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। যে কোম্পানি যত কম লভ্যাংশ দেবে, সেই কোম্পানির ক্ষেত্রে তত কম মার্জিন ঋণ অনুমোদন করা উচিত। বড় বিনিয়োগকারী বা বড় পরিসরে লেনদেনকারীদের জন্য মার্জিন ঋণ সহায়ক ব্যবস্থা হতে পারে। তবে বাংলাদেশের বাজার বাস্তবতায় এ বিষয়ে সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন।

ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী আরও বলেন, বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকলে অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী সীমিত মূলধন নিয়ে বেশি মার্জিন ঋণ গ্রহণ করেন। কিন্তু বাজারে সংশোধন শুরু হলে অতিরিক্ত ঋণের চাপ তাদের ঝুঁকিতে ফেলে। তাই নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত নেওয়া জরুরি।

শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে মার্জিন ঋণের প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। তবে অতিরিক্ত উদারনীতির পক্ষে নয় সংগঠনটি। ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, বাজারে তারল্য বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করতে হবে। মার্জিন ঋণের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা ভালো উদ্যোগ। তবে এটি যেন অতিরিক্ত উদার না হয়।

কারণ, অতীতে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর বিনিয়োগের কারণে যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি এড়াতে হবে। আমরা খসড়া বিধিমালা পর্যালোচনা করছি। কয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে কমিশনে পর্যবেক্ষণ জানানো হবে।