বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারের শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের সুবাদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ মিউচুয়াল ফান্ডের মুনাফায় বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে। নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা ১৫টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের সম্মিলিত মুনাফা এক বছরে ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১৪৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ১৪১ কোটি টাকার বেশি।

এর মধ্যে আগের অর্থবছরে লোকসানে থাকা ১১টি ফান্ড মুনাফায় ফিরেছে। তবে মুনাফার এই প্রত্যাবর্তনেও ইউনিটধারীদের স্বস্তি মেলেনি। আগের বছরগুলোর পুঞ্জীভূত লোকসানের কারণে অধিকাংশ ফান্ড ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। নিরীক্ষিত আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করা ১৫টি ফান্ডের মধ্যে মাত্র চারটি নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে পুঁজিবাজারে চলা মন্দার কারণে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। চলতি অর্থবছরে বাজার ঘুরে দাঁড়ালেও আগের লোকসান পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি বেশির ভাগ ফান্ড। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ মিউচুয়াল ফান্ড বড় অঙ্কের মুনাফা করেছে। তবে ফান্ডগুলো ঘুরে দাঁড়ালেও ‘ভরসা’ করা বিনিয়োগকারীদের কপাল খোলেনি। কারণ আগের বছরগুলোর পুঞ্জীভূত লোকসানের কারণে মুনাফা করেও অধিকাংশ ফান্ড এবার বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি।

ফলে তালিকাভুক্ত ৩৪টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১৬টি ফান্ড নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম যাচাইয়ের আওতায় রয়েছে। ফলে এসব ফান্ডের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। আর তিনটি ফান্ড জানুয়ারি-ডিসেম্বর ভিত্তিতে হিসাব বছর অনুসরণ করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা ১৫টি ফান্ডের সব কটিই আলোচিত বছরে মুনাফা করেছে।

এর মধ্যে ১১টি ফান্ড আগের বছর লোকসানে থাকার পর এবার মুনাফায় ফিরেছে। বাকি চারটি ফান্ডের মুনাফাও আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। ভালো মুনাফা করা সত্ত্বেও ১৫টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে মাত্র চারটি ফান্ড আলোচিত অর্থবছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হওয়া চার ফান্ডের তিনটি লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর লোকসান কাটিয়ে মুনাফায় ফেরা অপর ফান্ডও লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সর্বশেষ অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে পুঁজিবাজার তুলনামূলক ভালো পারফরম্যান্স করায় অধিকাংশ ফান্ডের মুনাফা বেড়েছে। তবে আগের বছরগুলোর বড় ধরনের লোকসানের কারণে অনেক ফান্ডের পুঞ্জীভূত মুনাফা তহবিল এখনো ঋণাত্মক রয়েছে। ফলে এ বছরের মুনাফা দিয়ে আগের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ না হওয়ায় অনেক ফান্ডই বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি।

তাছাড়া, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ফান্ড নিট মুনাফা করলেও ট্রাস্টিরা চাইলে নগদ লভ্যাংশ না দিয়ে সেই অর্থ ফান্ডের সুরক্ষায় সংরক্ষণ করতে পারেন। এ কারণেও কোনো কোনো ফান্ড লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স অর্থবছরটিতে প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৭৬৩ পয়েন্টে উঠে। একই সময়ে ডিএসইর বাছাই করা ৩০ কোম্পানির সূচক ডিএস৩০ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১৭৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। বাজার মূলধনও প্রায় ৩৬ হাজার ৪২১ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়ে ৬ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

মিউচুয়াল ফান্ডগুলো মূলত পুঁজিবাজারের বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। তারা ডিএসইর বাছাই করা সূচক ডিএস৩০-এর কোম্পানিগুলোতে বেশি বিনিয়োগ করে থাকে। ফলে বাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লে এসব ফান্ডের পোর্টফোলিওর মূল্যও বাড়ে এবং শেয়ার বিক্রি করে মূলধনি মুনাফা করার সুযোগ তৈরি হয়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৫টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে ক্যাপিটেক গ্রামীণ ব্যাংক গ্রোথ ফান্ড। ক্যাপিটেক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট পরিচালিত এই ফান্ডটি আলোচিত অর্থবছরে ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে। আগের অর্থবছরে ফান্ডটির মুনাফা ছিল ৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুনাফা করেছে এইমস অব বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনায় থাকা গ্রামীণ ওয়ান স্কিম-২। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফান্ডটির মুনাফা হয়েছে ১৫ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এই মুনাফা ছিল ১৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট পরিচালিত আইসিবি এএমসিএল থার্ড এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড মুনাফার তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। ফান্ডটির মুনাফার পরিমাণ ১৪ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে ফান্ডটির ২০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছিল।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে থাকা আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট অগ্রণী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ডের মুনাফা হয়েছে ১৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে এই মুনাফা ছিল ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। তালিকার পঞ্চম অবস্থানে থাকা প্রাইম ব্যাংক ফার্স্ট আইসিবি এএমসিএল মিউচুয়াল ফান্ডের মুনাফা হয়েছে ১১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে ফান্ডটি ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা লোকসান করেছিল।

আগের অর্থবছরে ৪০ লাখ টাকা লোকসান করা আইসিবি এএমসিএল সোনালী ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১ কোটি ২০ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। ফনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড আগের অর্থবছরে ১ কোটি ২ লাখ টাকা লোকসান করলেও সর্বশেষ অর্থবছরে ৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা মুনাফা করেছে। আর আলোচিত অর্থবছরে ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা মুনাফা করা আইএফআইএল ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড-১ আগের অর্থবছরে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা লোকসান করেছিল।

এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আইসিবি এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ান: স্কিম ওয়ান ৮ কোটি ৪০ লাখ, আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড মিউচুয়াল ফান্ড ৭ কোটি ৩৫ লাখ, রিলায়েন্স ওয়ান মিউচুয়াল ফান্ড ৭ কোটি, সিএপিএম বিডিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড ৬ কোটি ৭৭ লাখ, এসইএমএল এফবিএলএসএল গ্রোথ ফান্ড ৬ কোটি ৫৭ লাখ এবং সিএপিএম আইবিবিএল ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা মুনাফা করেছে।

আগের অর্থবছরে ফান্ডগুলো যথাক্রমে ১ কোটি ৭৩ লাখ, ৭৫ লাখ, ১ কোটি ৮৮ লাখ, ৫ কোটি ৭৭ লাখ, ৭ লাখ এবং ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা লোকসান করেছিল। আর সর্বশেষ অর্থবছরে ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা মুনাফা করা এসইএমএল আইবিবিএল শরিয়াহ ফান্ড আগের অর্থবছরে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল।