শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের কিছুটা উত্থানে লেনদেন শেষ হয়েছে। তবে সূচকের কিছুটা উত্থান হলেও আতঙ্ক কাটছে না বিনিয়োগকারীদের। কারণ টানা ১১ কার্যদিবস দরপতনের পর কিছুটা সূচকের উত্থান হলেও দীর্ঘ ৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন লেনদেন হয়েছে। এমনকি ডিএসইর লেনদেন চারশ কোটি টাকার ঘরে নেমেছে। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মুলত দেশের পুঁজিবাজার যেন দীর্ঘদিন ধরে এক অদৃশ্য সংকটের মধ্যে আটকে আছে। রাজনৈতিক সরকার বদলেছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে এসেছে নতুন মুখ, নতুন বাজেটেও পুঁজিবাজারের গতি ফেরাতে বেশ কিছু ব্যবসাবান্ধব ও ইতিবাচক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু তারপরও পুঁজিবাজারে কাঙ্খিত গতি ফিরছে না। সূচক স্থবির, লেনদেন কম ও নতুন বিনিয়োগকারীর আগ্রহ নেই, আর পুরোনো বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ এখনো আস্থাহীন। ফলে লেনদেন খরা দেখা দিয়েছে পুঁজিবাজারে।
অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা বলেন, বিএসইসি ও ডিএসইর অযাচিত হস্তক্ষেপে আস্থা সংকটে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। যার ফলশ্রুতিতে ধারাবাহিক পতনে ডিএসইর মূল সূচক প্রায় দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমেছে। এমনকি লেনদেনের পরিমাণও পাঁচ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কমেছে।

অথচ এই পরিস্থিতিতেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি করেছে। অনেকেই এখন বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। ইতিমধ্যেই বর্তমান কমিশনের প্রতি আস্থা হারিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
দিন দিন এই কমিশনের ব্যর্থতার বোঝা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নতুন সরকার গঠনের পর বাজার যখন স্থিতিশীলতার পথে যাচ্ছিল, তখনই এই কমিশনের নিস্কিয়তায় থমকে দাঁড়িয়েছে। সরকার বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও বাজার উন্নয়নের জন্যই নতুন এই কমিশন গঠন করেছিল, কিন্তু তাদের প্রত্যাশা পূরণের বদলে তা হতাশায় পরিণত হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজার মন্দাবস্থার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিস্কিয়তা। বাজারের বড় মূলধনি ও ভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক সাপোর্ট না থাকায় সূচকের সামান্য উত্থানও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বড় তহবিলগুলো হাত গুটিয়ে থাকায় সাধারণ ও খুচরা বিনিয়োগকারীরাও নতুন করে পুঁজি খাটাতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে বাজারে ক্রেতার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দৈনিক মোট লেনদেনের অঙ্কে।
তারা বলছেন, লাগাতার লোকসান ও নীতিগত অস্পষ্টতার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা চরম রূপ নিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ সত্ত্বেও বাজার স্থিতিশীলতার কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে সাময়িকভাবে সূচক কিছুটা ইতিবাচক হলেও লেনদেনের এমন তলানি সূচক দীর্ঘমেয়াদে বাজারের ভঙ্গুর পরিস্থিতিকেই নির্দেশ করে। টেকসই বাজার নিশ্চিতে দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক সক্রিয়তা ফেরানো এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মহসিন খান বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা ও দরপতন অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে সাধারণ ও বড় বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে বাজারের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত করে বিএসইসি-ডিএসইর অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। বিএসইসি-ডিএসইর অযাচিত হস্তক্ষেপে প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় বিনিয়োগকারীরা নিস্কিয় হয়ে পড়ছেন। যার ফলে ডিএসইতে লেনদেন ৪০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে আসছে।
জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ১৫ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৬৫৫ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৫ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ১৩২ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৮ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ২ হাজার ১৩৪ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯৩ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১৮৫ টির, দর কমেছে ১৪৪ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৬৪ টির। ডিএসইতে ৪৬৭ কোটি ১ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৩৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৫০৬ কোটি ৭১ লাখ টাকার।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ১৬৬ পয়েন্টে। সিএসইতে ২৭১ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৭১ টির দর বেড়েছে, কমেছে ৮০ টির এবং ২০ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ২১ কোটি ২৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।