চট্টগ্রাম ও কুয়াকাটা প্রতিনিধি,  দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বঙ্গোপসাগরে শুরু হয়েছে ইলিশের মৌসুম। গভীর সাগরে জাল ফেললেই ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ। কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে মাছের সরবরাহ তুলনামূলক কম ছিল, সেখানে বর্তমানে মাছভর্তি ট্রলার নিয়ে একের পর এক জেলে ফিরছেন চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাটে। ফলে দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি আবারও ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা ব্যস্ততা। ভোরের আলো ফোটার আগেই ফিশারি ঘাটে শুরু হয় কর্মচাঞ্চল্য।

গভীর সমুদ্র থেকে আসা ট্রলারগুলো ঘাটে ভিড়তেই শ্রমিকেরা দ্রুত মাছ নামানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এরপর ওজন, বাছাই ও নিলামের মাধ্যমে পাইকারদের কাছে বিক্রি হয় ইলিশ। তেমনি পটুয়াখালীর কুয়াকাটার আলীপুর-মহিপুর মৎস্য বন্দরে ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা ব্যস্ততা। মৎস্য বন্দরে একটি মাছ ধরার ট্রলারে ৮০ মণ ইলিশ ধরা পড়েছে। এতে জেলেদের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। সাগরে ধরা এসব ইলিশ আলীপুরের আড়তে এনে নিলামের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

জানা গেছে, এফবি আব্দুল্লাহ নামের মাছ ধরার ট্রলারটি বাদশা মাঝি ১৮ জেলেকে নিয়ে চার দিন আগে গভীর সাগরে মাছ শিকারের উদ্দেশে যাত্রা করেন। দুই দিন সাগরে মাছ ধরার পর বুধবার পায়রা বন্দরের শেষ বয়ার কাছাকাছি এলাকায় জেলেদের জালে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ে। একইদিন বিকালে মাছগুলো আলীপুর মৎস্য বন্দরের সিফাত ফিশে নিয়ে আসা হয়। সেখানে নিলামের মাধ্যমে মাছগুলো ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।

ট্রলারটির মাঝি বাদশা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাগরে বড় মৌসুমের মতো ইলিশের দেখা পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ গতকাল প্রায় ৮০ থেকে ৯০ মণ ইলিশ ধরা পড়ে। তবে মাছগুলো তুলনামূলক ছোট। এসব মাছ ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছি। চার দিন আগে ১৮ জন জেলে নিয়ে সাগরে গিয়েছিলাম। দুই দিন মাছ ধরার পর মাছগুলো আলীপুরে এনে বিক্রি করেছি।

কলাপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরে বেশ কিছুদিন ইলিশের খরা চলছিল। বর্তমানে জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ছে। বৃষ্টি হলে আরও বেশি ইলিশ ধরা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে মৎস্য বন্দরের ইলিশ সংশ্লিষ্ট সবাই লাভবান হবেন। ঘাটজুড়ে তখন শোনা যায় দর হাঁকার শব্দ, চলে ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষি।

মৎস্য সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে হাজার হাজার ফিশিং ট্রলার মাছ আহরণে নিয়োজিত রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ২০টি ট্রলার ইলিশ নিয়ে চট্টগ্রাম ফিশারি ঘাটে ফিরছে। অনুকূল আবহাওয়া ও মাছের উপস্থিতি বেশি থাকলে এ সংখ্যা আরও বাড়ছে। ফলে ঘাটে জেলে, আড়তদার, শ্রমিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের ব্যস্ততাও বেড়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য দপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত জুলাই মাসে চট্টগ্রাম উপকূল ও নদী এলাকা থেকে ১ হাজার ৫৭২ টন ইলিশ আহরণ হয়েছে। সংখ্যার হিসাবে যা প্রায় ৩৫ লাখ মাছ। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ইলিশ এসেছে সমুদ্র অঞ্চল থেকে। সবচেয়ে বেশি আহরণ হয়েছে চট্টগ্রাম উপকূল ও সন্দ্বীপ চ্যানেল এলাকায়।

ফিশারি ঘাটের আড়তগুলোতে বর্তমানে আকারভেদে প্রতি মণ ইলিশ ১৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অনেক আড়তে মাঝারি আকারের ইলিশের মণপ্রতি দাম ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে। সে হিসাবে ঘাট পর্যায়ে প্রতি কেজি ইলিশের দাম দাঁড়ায় প্রায় ৬২০ থেকে ৬৪০ টাকা।

ব্যবসায়ী মো. জসিম বলেন, ঘাটে সরবরাহ বাড়লেও এর পুরো সুফল এখনও পৌঁছেনি খুচরা বাজারে। নগরের বিভিন্ন বাজারে ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ ৯০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রায় ২ হাজার টাকা এবং দেড় কেজির বেশি ওজনের বড় ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ৩ হাজার টাকারও বেশি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্য, পরিবহন ব্যয়, আড়তদারি খরচ এবং বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় ঘাট ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, সরবরাহ বাড়লেও বাজারে প্রত্যাশিত হারে দাম কমছে না।

মৎস্য কর্মকর্তারা মনে করছেন, অমাবস্যা ও পূর্ণিমাকেন্দ্রিক জোয়ার-ভাটার অনুকূল পরিবেশে সমুদ্রে ইলিশের চলাচল বেড়েছে। ফলে জেলেরা আগের তুলনায় বেশি মাছ পাচ্ছেন। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে সরবরাহ আরও বাড়তে পারে এবং বাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাটে এখন যেন রুপালি উৎসবের আমেজ।

জেলেদের মুখে স্বস্তির হাসি, আড়তে বাড়ছে লেনদেন, কর্মসংস্থান পাচ্ছেন শত শত শ্রমিক। তবে সাধারণ ক্রেতারা অপেক্ষায় আছেন এমন দিনের, যখন গভীর সমুদ্রে ধরা পড়া এই রুপালি সম্পদের সুফল সত্যিকার অর্থেই পৌঁছে যাবে তাদের রান্নাঘরেও।