ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম থেকে অরগানোগ্রাম বাদ চায় ডিএসই
মেহেদী হাসান, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারের ক্রমবর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তনের অতিরিক্ত স্বাধীনতা চাইছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। এই লক্ষ্যে ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম থেকে প্রস্তাবিত অরগানোগ্রামটি বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে দেশের প্রধান এই পুঁজিবাজার।
ডিএসইর যুক্তি হলো, অরগানোগ্রাম মূলত একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিচালন কাঠামোর অংশ, যা সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকে। ব্যবসার ধরন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক ভালো চর্চার সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু বর্তমানে এই কাঠামো ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থাকায় সামান্য পরিবর্তন আনতে গেলেও দীর্ঘ প্রক্রিয়াগত জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
সম্প্রতি বিএসইসির চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো একটি চিঠিতে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এই বিষয়ে কমিশনের নজর আকর্ষণ করেছেন। এর আগে গত মার্চ মাসেও ডিএসইর চেয়ারম্যান একই বিষয়ে একবার চিঠি দিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক চিঠিটি সেই পুরোনো আবেদনেরই ধারাবাহিকতা, যেখানে প্রস্তাবটি নতুন করে বিবেচনা করে অনুমোদনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ডিএসইর পর্ষদ মনে করছে, অরগানোগ্রামকে স্কিম থেকে আলাদা করা গেলে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন দক্ষতা বাড়বে, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন দ্রুততর হবে এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স আরও কার্যকর হয়ে উঠবে। ডিএসইর এই আবেদনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ডিমিউচুয়ালাইজেশনের মৌলিক কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে স্পষ্ট একটি সীমারেখা টানা।
ডিমিউচুয়ালাইজেশন প্রক্রিয়ায় একটি স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকানা, পরিচালনা ও ট্রেডিং অধিকার একে অপরের থেকে পৃথক করা হয়, যার মাধ্যমে পুরোনো পারস্পরিক-স্বার্থনির্ভর কাঠামো থেকে বেরিয়ে অধিকতর পেশাদার ও স্বচ্ছ একটি ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটে।
ডিএসইর বক্তব্য, এই মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগ, পদ বা প্রশাসনিক স্তর চিরস্থায়ীভাবে যুক্ত থাকার প্রয়োজন নেই। যেহেতু ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দলিল, তাই তার মধ্যে ক্রমপরিবর্তনশীল কোনো বিষয় জুড়ে দিলে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে গিয়ে জটিলতা বাড়তে পারে। এ কারণে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে অরগানোগ্রাম অনুমোদন ও হালনাগাদ করার দায়িত্ব সরাসরি পরিচালনা পর্ষদের হাতে থাকা উচিত বলে মনে করে ডিএসই তবে অবশ্যই কোম্পানি আইন ও নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা মেনে।
আবেদনে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে স্বয়ংক্রিয় লেনদেন ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, উন্নত ডেটা বিশ্লেষণ, সাইবার নিরাপত্তা ও রিয়েল-টাইম বাজার তদারকির মতো প্রযুক্তি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এসবের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অভ্যন্তরীণ বিভাগ ও জনবল কাঠামোতেও পরিবর্তন দরকার হতে পারে। কিন্তু অরগানোগ্রাম যদি স্কিমের অপরিবর্তনীয় অংশ থেকে যায়, তাহলে প্রতিটি ছোটখাটো পরিবর্তনের জন্যও বাড়তি অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যা বাজারের চাহিদা দ্রুত পূরণের সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছে ডিএসই।
একই যুক্তি প্রযোজ্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও। লেনদেনের পরিমাণ, প্রযুক্তিনির্ভরতা ও আর্থিক পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার, প্রযুক্তি, সাইবার ও পরিচালনগত ঝুঁকির ধরনও বদলাচ্ছে, যার জন্য মাঝেমধ্যেই নতুন ইউনিট গঠন বা কাঠামো পুনর্বিন্যাসের দরকার পড়ে। চিঠিতে দেশের অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের উদাহরণও তুলে ধরেছে ডিএসই, যেখানে অরগানোগ্রামকে ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের অংশ করা হয়নি। এ থেকেই স্পষ্ট হয় যে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো ও অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা আলাদা রাখা সম্ভব বলেই মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের একটি নির্দিষ্ট ধারার উদ্ধৃতি দিয়ে ডিএসই ব্যাখ্যা করেছে, একটি সর্বোত্তম সাংগঠনিক কাঠামো নিশ্চিত করার অর্থ কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোকে দীর্ঘদিন অপরিবর্তিত রাখা নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী তা উন্নত করার সুযোগ রাখা। এ ছাড়া স্কিমটি পাঁচ বছর অন্তর পর্যালোচনার কথা থাকলেও তা এখনো হয়নি বলে জানিয়েছেন ডিএসইর চেয়ারম্যান। বর্তমানে অন্যান্য দেশের অনুরূপ কাঠামো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ চলছে বলেও জানানো হয়েছে।
ডিএসই স্পষ্ট করেছে, তাদের লক্ষ্য নিয়ন্ত্রক তদারকি এড়িয়ে যাওয়া নয় বরং মালিকানা, পরিচালনা ও ট্রেডিং অধিকারের পৃথকীকরণের মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে অরগানোগ্রামকে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার একটি নমনীয় উপাদান হিসেবে পরিচালনা করা। এখন এই প্রস্তাব নিয়ে বিএসইসি কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই সবার নজর। অনুমোদন মিললে ভবিষ্যতে সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তনে প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমতে পারে; না হলে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই সমাধান খুঁজতে হবে ডিএসইকে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই আবেদন শুধু একটি প্রশাসনিক অনুরোধ নয় বরং দেশের পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতার ভারসাম্য নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।



