দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ব্যক্তি এজেন্সি কার্যক্রম স্থগিত থাকার পরও কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে। এছাড়া কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা ব্যয় সীমা বাড়ানোর পরও অতিরিক্ত ব্যয় কমেনি। বিগত ৫ বছরে কোম্পানিটি অতিরিক্ত ব্যয়ের নামে ১০৪ কোটি টাকা খেয়ে ফেলেছে। যা বীমা আইন অনুসারে এই অতিরিক্ত ব্যয় অবৈধ। কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

এছাড়া গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধেও অন্তত পাঁচটি পলিসিতে বিধি বহির্ভূত এনসিবি দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যা অধিকাংশই কমলাপুর ব্রাঞ্চ থেকে ইস্যু করা হয়েছে। এসব পলিসিতে ৪০ ও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়েছে। গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের কমলাপুর ব্রাঞ্চের ইনচার্জ ইভিপি কামরুন নাহার (বিনা) বলেন, প্রথম বছর থেকেই নো ক্লেইম বোনাস দেওয়ার নিয়ম নেই। নিয়ম না থাকা সত্ত্বেও কেন দেওয়া হয়েছে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এখন ব্যস্ত আছি। পরে জানাবো।

বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ব্যয় কোম্পানির আর্থিক ভিত দুর্বল করে দেয়। কোম্পানির শেয়ারহোল্ডাররা তাদের প্রাপ্য লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে কোম্পানির তহবিল তছরুপ করা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার। ১৯৫৮ সালের পুরনো বিধি অনুসারে, ফায়ার ও অন্যান্য বীমায় সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ খরচের সুযোগ ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের সংশোধিত বিধিতে এই সীমা কয়েক ধাপে বাড়িয়ে ১৫ কোটি টাকার স্ল্যাবে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়। একইভাবে মেরিন ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রেও বাড়ানো হয় ব্যয়সীমা।

তুলনামূলক হিসাব করে দেখা যায়, ২০২৪ সালে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স ৮৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে। ২০১৮ সালের ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের বিধিমালা অনুসারে ২০২৪ সালের মোট প্রিমিয়াম সংগ্রহের জন্য গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের ব্যয় করতে পারে ২৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। আর ব্যয় করেছে ৫১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় করেছে ২৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা অনুমোদিত সীমার চেয়ে ১০৬.৭৮ শতাংশ বেশি।

অপর দিকে ১৯৫৮ সালের বিধিমালা অনুসারে ব্যয় করতে পারে ১১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ১৯৫৮ সালের ব্যবস্থাপনা ব্যয় সীমার সাথে ২০১৮ সালের সংশোধিত বিধিমালার ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা তুলনা করলে দেখা যায়, অনুমোদিত ব্যয়ের পরিমাণ বেড়েছে ১১৩ শতাংশ, যা দ্বিগুণের বেশি।

আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স মোট ৪৬৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা গ্রস প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেছে। প্রবিধানমালা অনুযায়ী, এই প্রিমিয়াম সংগ্রহের বিপরীতে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের অনুমোদিত সীমা ছিল ১৩৫ কোটি ৮ লাখ টাকা। অথচ এই সময়ে কোম্পানিটি খরচ করেছে ২৩৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরে কোম্পানিটি ১০৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছে, যা কোম্পানিটির অনুমোদিত ব্যয়সীমার চেয়ে ৭৬.৬২ শতাংশ বেশি।

গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের গত ১২ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত ব্যয় করে ২০২৩ সালে। ওই বছর ৯৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করতে গিয়ে ব্যয় করে ৫৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। আর ব্যয়ের অনুমোদন ছিল মাত্র ২৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, অনুমোদিত সীমার চেয়ে ৩১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বা ১০৬.৭৮ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। ২০১৮ সালে ব্যয় সীমা বাড়িয়ে সংশোধিত বিধিমালা করে সরকার।

এর পরের বছর ২০১৯ সালে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স অনুমোদিত সীমার চেয়ে ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা কম খরচ করে। যা বিগত ১২ বছরের (২০১৩-২০২৪ সাল) মধ্যে সবচেয়ে কম। অতিরিক্ত ব্যয়ের এই ধারা ২০২৪ সালেও অব্যাহত ছিল গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সে। ওই বছর কোম্পানিটি ২৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ করে।

৮৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহে ২৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা খরচের অনুমোদন থাকলেও কোম্পানিটির খরচ দাঁড়ায় ৫১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এর আগে ২০২১ সালে ৯০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা গ্রস প্রিমিয়াম সংগ্রহ করতে ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ২০২০ সালে ৭৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহে ৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স।

আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল এই পাঁচ বছরে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সে ১৩৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহে ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয় করেছে ৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অথচ ১৯৫৮ সালের বীমা বিধি অনুসারে, ওই সময় কোম্পানিটির মোট ব্যয়ের অনুমোদন ছিল ২৩ কোটি ৫ লাখ টাকা। এই হিসাবে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স ১০ কোটি ৩৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করে।

এর মধ্যে: ২০১৭ সালে, ৪ কোটি টাকা, ২০১৬ সালে ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করে। এ ছাড়াও ২০১৮ সালে ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, ২০১৫ সালে ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, ২০১৪ সালে ৭৪ লাখ টাকা এবং ২০১৩ সালে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স।

আর্থিক প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২০২২ সালে কোম্পানিটির গ্রস প্রিমিয়াম ছিল ১১৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৮৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকায়। তবে প্রিমিয়াম সংগ্রয়ের পরিমাণ কমলেও ব্যয় কমেনি। ২০২৪ সালেই কোম্পানিটি অনুমোদিত সীমার চেয়ে ২৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা বেশি খরচ করেছে।

২০২৩ সালেও গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম সংগ্রহ ১৬.৭৩ শতাংশ কমে ৯৫ কোটি ৭০ লাখ টাকায় নেমে আসে। অথচ ওই বছরও কোম্পানিটি ৩১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ করেছে। ২৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন থাকলেও কোম্পানিটি খরচ করে ৫৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

কোম্পানির প্রিমিয়াম সংগ্রহের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, করোনা মহামারীর বছরেও কোম্পানিটির প্রিমিয়াম সংগ্রহ ১২.৪২ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৯ সালে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের মোট প্রিমিয়াম সংগ্রহ ছিল ৬৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। যা ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৭৬ কোটি ৬৯ কোটি টাকা। এ বিষয়ে গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জামিরুল ইসলাম সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।