পুঁজিবাজারে টানা পতন ঠেকাতে নেই বিএসইসির দৃশ্যমান উদ্যোগ
শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: চরম স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন দেশের পুঁজিবাজার হাটঁছে কোন পথে। আমাদের দেখার মতো কি কেউ নেই। ধারাবাহিক পতনে দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি। ফলে টানা দরপতনে চলছে বিনিয়োগকারীদের রক্তক্ষরণ। এছাড়া ডুবতে থাকা পুঁজিবাজার টেনে তুলবে কোন কান্ডারী? ফলে দেশের পুঁজিবাজারে দরপতনের ধারা যেন থামছেই না।
তেমনি গত ১৬ বছরে পুঁজিবাজার ছেড়েছে প্রায় ১৭ লাখ বিনিয়োগকারী। আর এক দশকের বেশি সময়ে পুঁজিবাজার সংকুচিত হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বছর পনেরো আগে পুঁজিবাজারে বড় ধসের পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ড. এম খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুন কমিশন গঠন করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
দীর্ঘ ৯ বছর দ্বায়িত্বে থেকেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয় সেই কমিশন। শুধু খায়রুল কমিশন নয়, এরপর বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পাওয়া অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম ও রাশেদ মাকসুদের কমিশনের অধীনে পুঁজিবাজার সংস্কারের অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বিনিয়োগকারীদের মাঝে কাঙ্খিত আস্থা ফেরাতে পারেনি। এর পর ২০২৬ সালের জুন মাসে মাসুুদ খানের নেতৃত্বে গঠিত বিএসইসির নতুন কমিশন ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার ও কৃত্রিম হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালুর মতো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিলেও দীর্ঘদিনের অনাস্থা ও বাজার মন্দা পুরোপুরি কাটিয়ে আস্থার সংকট এখনও কাটেনি।
এদিকে বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানো ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘদিনের দুর্বলতা দূর করতে একাধিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মূলত বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেই কমিশনের কেটেছে ছয় মাস। ফলে পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানোই এখন সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
এছাড়া গত ছয় মাসে দুর্বল লোকসানী শেয়ারের দাম হু হু করে বাড়লেও ভালো মৌল ভিত্তি শেয়ারের দাম বাড়েনি। এর ফলে পুঁজিবাজারে কারসাজিতে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে এআই প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন সূচকের পতনে কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর। তবে টাকার পরিমাণে লেনদেন কিছুটা বেড়েছে। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কয়েক দফা বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। গত ২৫ আগস্ট পতনের পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেন ৫০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে আসে। ওইদিন ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫০৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা, যা প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এরপর গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে সূচক কিছুটা বাড়লেও লেনদেন কমে ৪৬৭ কোটি ১ লাখ টাকা হয়।
গত ১৬ মার্চের পর যা সব থেকে কম। এর আগে টানা কয়েক কার্যদিবস বাজারে দরপতন অব্যাহত ছিল। ১৮ আগস্ট পর্যন্ত টানা পাঁচ কার্যদিবস পতনের মধ্যে ছিল পুঁজিবাজার। ওই সময়ে ভালো-মন্দ নির্বিশেষে বিভিন্ন খাতের শেয়ারে ব্যাপক বিক্রির চাপ দেখা যায়।
অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীদের মতে, পুঁজিবাজারে টানা দরপতন এখন অনেকটা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজার যেভাবে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছিল, কোনো এক অদৃশ্য কারণে সেই ধারায় এখন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বাজারকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা থাকলেও টানা দরপতনে সেই প্রত্যাশা ক্রমেই হতাশায় পরিণত হচ্ছে। বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হচ্ছে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা দরপতনের মধ্যেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তৎপরতা না থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি মার্চেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, পুঁজিবাজারে বারবার উত্থান-পতনের ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। এতে তাঁদের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে গেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতার কারণে কিছু কোম্পানির শেয়ারের দামের অস্বাভাবিক উত্থান-পতন ঘটেছে। কিন্তু বিএসইসির দিক থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে বাজার আর স্বাভাবিক আচরণ করছে না।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি ও বিক্রির চাপ এবং বাজারে তারল্যের সংকট দরপতনের অন্যতম কারণ। পাশাপাশি বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী নতুন করে বিনিয়োগ না করে অপেক্ষার নীতি অনুসরণ করছেন। ফলে ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতার চাপ বাড়ছে। এতে হচ্ছে টানা দরপতন।
জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৪১ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৬১৪ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৪ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ১২৮ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ১২ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ২ হাজার ১২২ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯২ টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৪৯ টির, দর কমেছে ৩০৯ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৪ টির। ডিএসইতে ৫১৮ কোটি ৩ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৫১ কোটি ২ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৪৬৭ কোটি ১ লাখ টাকার।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৭৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯১ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৭৪টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৪২ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১১২ টির এবং ২০টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১১ কোটি ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।



