সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য অংশীদারের খোঁজ, মালিকানা ছাড়তে চায় সরকার
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেউলিয়ার মুখে থাকা পাঁচ শরিয়াভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের ৯ মাসের মাথায় রাষ্ট্রীয় মালিকানা ছেড়ে দিতে চায় সরকার। এজন্য বিদেশি বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কাতারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। অন্যান্য মুসলিম দেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও আলোচনায় আগ্রহী সরকার।
ফলে একীভূত হওয়া পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক নিয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে’র জন্য কৌশলগত বিদেশি অংশীদার (স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার) খুঁজছে সরকার, যারা মালিকানায় যুক্ত হয়ে নতুন বিনিয়োগ করে ব্যাংকটিকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কৌশলগত অংশীদার হতে প্রথম প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কাতারকে।
সম্প্রতি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একজন প্রতিনিধি কাতার সফরকালে এই প্রস্তাব দেন। যদিও কাতারের মনোভাব এখনো জানা যায়নি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে এ ক্ষেত্রে এখনো কোনো কমিটি করা কিংবা আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। খুব শিগগিরই একটি কমিটি করা হবে বলেও জানা যায়।
জানা যায়, বিভিন্ন অনিয়ম-জালিয়াতির কারণে দীর্ঘদিন আমানত ফেরত দিতে না পারায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক মিলে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন হয়। ব্যাংকগুলোতে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীর সঞ্চয়ী হিসাবে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
পাঁচ ব্যাংকের মোট এক লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণের ৮৬ শতাংশ এখন খেলাপি। আর মূলধন ঘাটতি রয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি। গত বছরের নভেম্বরে যাত্রা শুরু করা এই ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে।
জানা যায়, আর্থিক সংকট কমাতে এসব ব্যাংকের আমানতের বিপরীতে ২০০৪ ও ২০২৫ সালের জন্য ঘোষিত মুনাফার একটি অংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। যাকে হেয়ার কাট বলা হতো। তবে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে সরকার। একই সঙ্গে ব্যক্তি আমানতকারীদের প্রয়োজনীয় টাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও সরকারকে আর্থিক সহযোগিতা করতে হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্যাংকটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৯ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মতিপত্র (এলওআই) দেয় এবং ৩০ নভেম্বর চূড়ান্ত লাইসেন্স দেওয়া হয়। শুরু থেকেই ব্যাংকটি সরকারি মালিকানায় রাখার সিদ্ধান্ত ছিল।
ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে মূলধনে যুক্ত হওয়ার কথা। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কাতারের সঙ্গে আলোচনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগের কাঠামো, অংশীদারত্বের ধরন ও মালিকানা হস্তান্তরের বিষয়গুলো আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে। এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
নবগঠিত ব্যাংকটির মোট কর্মী ১৮ হাজার ৮১ জন। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৫ হাজার ৯৯৬, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৪ হাজার ৩৯, এক্সিম ব্যাংকে ৩ হাজার ৪৮৭, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ২ হাজার ৪৮৬ এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে ২ হাজার ৭৩ জন কর্মী রয়েছেন। পাঁচ ব্যাংকের সমন্বিত নেটওয়ার্কে রয়েছে ৭৬১টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ও ৯৭৫টি এটিএম বুথ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশই খেলাপি। সরকারের ধারণা, বিদেশি ও বেসরকারি অংশীদার যুক্ত হলে ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা ও পরিচালন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। তাই কাতারসহ আগ্রহী মুসলিম দেশগুলোর বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।



