৬৭ শতাংশ বেশি ভাড়ায় আইডিবি ভবনে যাচ্ছে আইডিআরএ
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিনের আগ্রহে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনে কার্যালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য বর্তমান কার্যালয়ের তুলনায় প্রতি বর্গফুটে ৫০ থেকে ৫২ টাকা বেশি ভাড়া দিয়ে প্রায় ৩২ হাজার বর্গফুট জায়গা নেওয়া হচ্ছে। এতে ভাড়া বাবদ ব্যয় বাড়বে সর্বোচ্চ প্রায় ৬৭ শতাংশ।
এতে সংস্থাটির মোট বার্ষিক অফিস পরিচালন ব্যয় বাড়বে ১ কোটি ৭৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকা বা ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু ফ্লোর ভাড়াই বাড়বে বছরে ২ কোটি ৬১ লাখ ২৩ হাজার টাকা বা ৮১ দশমিক ৭ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চেয়ারম্যানের যাতায়াতের সুবিধা এবং তার পরিচিতদের একটি অংশ আইডিবি ভবনে অফিস করায় সেখানে কার্যালয় স্থানান্তরে তিনি আগ্রহী হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলেছেন, আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিনের ইচ্ছায় অফিস পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মূলত তার ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য আইডিবি ভবনে অফিস স্থান্তরের মতো এত বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন। সূত্রটি জানায়, নিজের যাতায়াতের সুবিধা এবং বন্ধুমহলের একটা বড় অংশ আইডিবি ভবনে অফিস করেন বলে তিনি আইডিবি ভবনে যাওয়ার জন্য আগ্রহী। বিষয়টি তিনি একাধিক টেবিল আলোচনায় অকপটে বলেও থাকেন।
সূত্র মতে, ৩২ হাজার বর্গফুটের নতুন কার্যালয়ের জন্য সরকারের অনাপত্তি চাওয়ার মাত্র দুদিন পরই প্রায় ৫০ হাজার বর্গফুট জায়গা খুঁজতে নতুন কমিটি করেছে আইডিআরএ। গত ২০ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে আগারগাঁওয়ে কার্যালয় স্থানান্তরে অনাপত্তি চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়। এর দুদিন পর গত ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকার সুবিধাজনক স্থানে প্রায় ৫০ হাজার বর্গফুট জায়গা শনাক্ত করতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
আইডিআরএর নথি অনুযায়ী, দিলকুশার এসবিসি টাওয়ারে বর্তমানে সংস্থাটির কার্যালয়ের আয়তন ২৯ হাজার ৮৭৬ বর্গফুট। প্রতি বর্গফুটে মাসে ৭৮ থেকে ৮০ টাকা ভাড়ায় বছরে মূল ফ্লোর ভাড়া বাবদ ব্যয় হয় ৩ কোটি ১৯ লাখ ৫৬ হাজার ৯৬০ টাকা। আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনের ১১, ১৫, ১৬ ও ১৭ তলা এবং নিচতলার একটি অংশে প্রায় ৩২ হাজার বর্গফুট কার্যালয় নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। যার আয়তন ৩১ হাজার ৯৮৯ বর্গফুট। সেখানে প্রতি বর্গফুটে মাসে ভাড়া দিতে হবে ১৩০ টাকা। এতে বছরে মূল ফ্লোর ভাড়া দাঁড়াবে ৫ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
অর্থাৎ শুধু ফ্লোর ভাড়া বাবদ বছরে বাড়তি দিতে হবে ২ কোটি ৬১ লাখ ২৩ হাজার ৪০ টাকা।
প্রতি বর্গফুটে মাসিক ভাড়া বাড়ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকা। বাড়তি ২ কোটি ৬১ লাখ টাকাই আইডিআরএর প্রকৃত অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় নয়। কারণ নতুন ভাড়ার মধ্যে ২০টি গাড়ির পার্কিং, পানি ও পয়োনিষ্কাশন, নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় এসি রক্ষণাবেক্ষণ ও জেনারেটরের খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বর্তমানে দিলকুশায় এসব সেবার জন্য আলাদাভাবে বছরে ৮৫ লাখ ৬৯ হাজার ৯৪৪ টাকা দিতে হয়।
সব খরচ সমন্বয়ের পর আইডিআরএর বার্ষিক অফিস পরিচালন ব্যয় ৫ কোটি ৯৫ লাখ ২ হাজার ৯০৪ টাকা থেকে বেড়ে ৭ কোটি ৭০ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ বছরে বাড়তি ব্যয় হবে ১ কোটি ৭৫ লাখ ৫৩ হাজার ৯৬ টাকা বা ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ। দুই জায়গাতেই বিদ্যুৎ বিল বছরে প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা অপরিবর্তিত থাকবে। দিলকুশায় থাকা ডিজাস্টার সেন্টারের (ডিআর) বার্ষিক ভাড়াও ৩২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা বহাল থাকবে।
আইডিবি ভবনে সাধারণ বাণিজ্যিক ভাড়া প্রতি বর্গফুটে ২৫০ টাকা। গত ১৮ আগস্ট ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক-বাংলাদেশ ইসলামিক সলিডারিটি এডুকেশন ওয়াকফের (আইডিবি ভবন পরিচালনাকারী) জ্যেষ্ঠ প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী জাহিদ-আল-মাহাদী আইডিআরএ চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে বিশেষ হারে ভ্যাট ছাড়া প্রতি বর্গফুটে ১৫১ টাকা ভাড়ার প্রস্তাব দেন। এরপর গত ৭ সেপ্টেম্বর আইডিআরএর নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন) মনিরা বেগম প্রতি বর্গফুটে ১১৮ টাকা ‘অল-ইন’ ভাড়ার পাল্টা প্রস্তাব দেন।
এতে মূল ভাড়া ৭৫ টাকা এবং ইউটিলিটি ও সেবা বাবদ ৪৩ টাকা ধরা হয়। ২০টি গাড়ির পার্কিং, জেনারেটর, নিরাপত্তা ও সেন্ট্রাল এসি রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি তিন বছরের চুক্তি এবং পরবর্তী ১০ বছর ভাড়া অপরিবর্তিত রাখার শর্তও দেওয়া হয়। পরে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ওয়াকফের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেশমা সুলতানার সই করা চিঠিতে প্রতি বর্গফুটে মাসিক ১৩০ টাকা ‘অল-ইন’ ভাড়া, ভ্যাট ছাড়া, চূড়ান্ত প্রস্তাব হিসেবে দেওয়া হয়।
এদিকে এসবিসি টাওয়ারের সপ্তম তলায় ৩ হাজার ৫০০ বর্গফুট জায়গায় থাকা আইডিআরএর ডিআর সেন্টার দিলকুশাতেই থাকবে। ভারী ও সংবেদনশীল কারিগরি সরঞ্জাম থাকায় এটি স্থানান্তর ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে প্রধান কার্যালয় আগারগাঁওয়ে গেলেও ডিআর সেন্টারের জন্য বছরে ৩২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হবে।
২০১৪ সাল থেকে এসবিসি টাওয়ারে কার্যালয় ব্যবহার করছে আইডিআরএ। নথিতে ভবনটির পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ঘাটতি ও সংস্কারের সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, নতুন ভবনে সভাকক্ষ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসার জায়গা, কেবিন ও নেটওয়ার্কিংসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিন্যাসে এককালীন সংস্কার ব্যয় হবে। এ ব্যয় বার্ষিক পরিচালন ব্যয়ের হিসাবে ধরা হয়নি।
আইডিআরএ তাদের কার্যালয় স্থানান্তরের জন্য ঢাকার আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনে প্রায় ৩১ হাজার ৯৮৯ বর্গফুট ফ্লোর স্পেস ভাড়া নিতে চায়। এ জন্য ভ্যাট ছাড়া সর্বসাকুল্যে প্রতি বর্গফুট ১৩০ টাকা ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে অনাপত্তি চাওয়া হয়েছে। বর্তমানে ঢাকার দিলকুশার ৩৭/এ নম্বর এসবিসি টাওয়ারে আইডিআরএর কার্যালয় রয়েছে।
সেখানে প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ৭৮ ও ৮০ টাকা। সে হিসাবে নতুন কার্যালয়ে প্রতি বর্গফুটে ভাড়া বাড়বে যথাক্রমে ৫২ ও ৫০ টাকা। অর্থাৎ বর্তমান ভাড়ার তুলনায় নতুন ভাড়া ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ ও ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। আইডিআরএর নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন) মনিরা বেগম স্বাক্ষরিত ২০ সেপ্টেম্বরের এক চিঠিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে এই ভাড়ার বিষয়ে অনাপত্তি চাওয়া হয়েছে।
আইডিআরএ কার্যালয় স্থানান্তরের বিষয়ে একটি বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, আইডিআরএর কার্যালয় পরিচালনার ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত এর চাপ বীমা কোম্পানিগুলোর ওপরও পড়তে পারে। কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যয় নির্বাহে খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থেরই ভূমিকা থাকে।
এ ছাড়া বেশিরভাগ বীমা কোম্পানির প্রধান কার্যালয় মতিঝিল-দিলকুশা এলাকায় হওয়ায় আগারগাঁওয়ে আইডিআরএ সরিয়ে নিলে নিয়মিত দাপ্তরিক যোগাযোগেও সময় ও ব্যয় বাড়বে। তাই শুধু নতুন কার্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা নয়, বাড়তি ব্যয় ও এর প্রভাব বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
বীমা বিশ্লেষক ও আইডিআরএর সাবেক সদস্য সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লা বলেন, আইডিআরএর বর্তমান কার্যালয়ের সাজসজ্জায় এরই মধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে। নতুন ভবনে গেলে আবারও সাজসজ্জায় অর্থ ব্যয় হবে। এ অর্থের কোনো পুনর্বিক্রয়মূল্যও থাকবে না। শুধু ভাড়ার বিষয় বিবেচনা না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা উচিত। আরেকটি ভাড়া ভবনে যাওয়ার পরিবর্তে নিজস্ব ভবন নির্মাণ বা নিজস্ব ভবনে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় কমার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইডিআরএর প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতিও শক্তিশালী হবে। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।



