দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দীর্ঘ এক যুগ পর আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিরছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের অন্যতম বড় আয়োজন বাটেক্সপো। আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে বাটেক্সপো ২০২৬। এবারের আয়োজন শুধু পোশাক প্রদর্শনী নয়, বরং বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সক্ষমতা, গত এক দশকের রূপান্তর, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‘সাফল্যের ঐতিহ্য, উদ্ভাবনের ভবিষ্যৎ’ বার্তাটি সামনে রেখে আয়োজিত বাটেক্সপো ২০২৬-এ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রেতা, খুচরা বিক্রেতা, পণ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান এবং ফ্যাশনশিল্পের নীতিনির্ধারক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। এতে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে নতুন ব্যবসার সুযোগ, দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশ্বখ্যাত পণ্য সংগ্রহ ও সরবরাহব্যবস্থা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান পিডিএস লিমিটেডের সম্পৃক্ততা এবারের আয়োজনকে আরও গুরুত্ববহ করে তুলেছে। পাশাপাশি প্রাইমার্ক, পেপকো, এমঅ্যান্ডএস, ওয়ালমার্ট গ্লোবাল সোর্সিং, কেমার্ট, কটন অন, পিডিএস ও এলসি ওয়াইকিকি-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ও আস্থার বিষয়টি তুলে ধরছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের এই আগ্রহ শুধু কম খরচে বিপুল পরিমাণ পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতার কারণে তৈরি হয়নি। গত এক দশকের বেশি সময়ে এ শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, শ্রমিক কল্যাণ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং টেকসই উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কারখানাগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে।

এর পাশাপাশি কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। একই সঙ্গে শুধু মৌলিক পোশাক উৎপাদনের বাইরে বিভিন্ন ধরনের নতুন পণ্য ও উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরির সক্ষমতাও বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক পোশাকের বাজারে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শুধু একটি উৎপাদন কেন্দ্র নয়, বরং মান, পরিবেশগত দায়িত্ব, শ্রমিক অধিকার, নির্ভরযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস হওয়ার পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তি তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে ‘বাংলাদেশে তৈরি’ পণ্যের পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। গত কয়েক বছরে পোশাকশিল্পের পরিবর্তনের ফলে এই পরিচয়ের সঙ্গে এখন মানসম্মত উৎপাদন, সামাজিক দায়বদ্ধতা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, নতুনত্ব এবং নির্ভরযোগ্যতার বিষয়গুলোও যুক্ত হচ্ছে।

এই শিল্পের প্রভাব শুধু পোশাক কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সুতা, কাপড়, রং ও রাসায়নিক, ধোলাই, পোশাকের আনুষঙ্গিক উপকরণ, পরিবহন, বন্দর ও লজিস্টিকস, ব্যাংকিং, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য সহযোগী শিল্পকে ঘিরে বড় একটি শিল্পভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভর করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনেও এ শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। শুধু কম দামে পোশাক সরবরাহ করাই এখন যথেষ্ট নয়। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, কার্বন নিঃসরণ কমানো, পানি ও জ্বালানির সাশ্রয়, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার, শ্রমিক কল্যাণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রেতাদের কাছে ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পও এসব পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে নিজেদের সক্ষমতা সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করছে।

বাটেক্সপো ২০২৬ সেই পরিবর্তনেরই একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী হিসেবে সামনে আসছে। এখানে আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ড, দেশীয় পোশাক প্রস্তুতকারক, নীতিনির্ধারক, বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি সরবরাহকারী এবং শিল্প উদ্যোক্তারা একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। এর মাধ্যমে নতুন ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়াদেশ, নতুন পণ্য তৈরি, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আয়োজকদের মতে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন শুধু বর্তমানের ক্রয়াদেশ পূরণের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে না। পরিবর্তিত বিশ্ববাজার, ক্রেতাদের নতুন চাহিদা, পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা, নতুন ধরনের কাঁচামাল এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিল্পটি ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে।

দীর্ঘ এক যুগ পর বাটেক্সপোর প্রত্যাবর্তন তাই বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য শুধু একটি প্রদর্শনী নয়। এটি দেশের পোশাকশিল্পে গত কয়েক বছরের পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা এবং নতুন সম্ভাবনা একসঙ্গে তুলে ধরার একটি বড় সুযোগ। এবারের আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির নতুন বার্তা পৌঁছে দেওয়াই মূল লক্ষ্য।

বাটেক্সপো ২০২৬-এর মূল বার্তা বাংলাদেশ শুধু আজকের পোশাকের ক্রয়াদেশ পূরণের জন্য প্রস্তুত নয়, আগামী দিনের বৈশ্বিক পোশাক ব্যবসার জন্যও নিজেদের আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলছে।