গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের তহবিল থেকে ৮৫০ কোটি টাকার উধাও
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক বিবরণীতে একাধিক চাপের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সাল শেষে বীমা ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে কোম্পানির পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে কোম্পানি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত স্বল্পমেয়াদি ঋণ রয়েছে ৩২৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। পাশাপাশি বিনিয়োগ ওঠানামা তহবিলে ৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকার আনরিয়েলাইজড লোকসান রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ নিরীক্ষা বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছেন নিরীক্ষক।
এছাড়া সম্পদ দেখানো হয়েছে ৪৬১ কোটি টাকার বেশি, অথচ এর বড় একটি অংশ বাস্তবে নগদায়নযোগ্য নয়। বিপরীতে গ্রাহকের পাওনা ৩০৯ কোটি টাকার বেশি। সব দায় পরিশোধের মতো লাইফ ফান্ডে নগদ অর্থও নেই। এমন আর্থিক অবস্থায় ২০২৩ সালে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৪৩ দশমিক ১২ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয় গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলো।
এই মালিকানা অধিগ্রহণে গ্রিন ডেল্টার প্রায় শত কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। একই সঙ্গে ২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদন, বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও অন্য নথি পর্যালোচনায় কারসাজি ও হিসাবের গোঁজামিলের মাধ্যমে কোম্পানিটির তহবিল থেকে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৯ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন, বিশেষ নিরীক্ষা এবং বিভিন্ন গোপন নথিপত্র পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সুপরিকল্পিত আর্থিক কারসাজির মাধ্যমে শুধু ইক্যুইটি বৃদ্ধির হিসাব দেখিয়েই তহবিল থেকে উধাও করা হয়েছে ৩৬৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
২০০৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির মোট মুনাফা, আয়কর এবং ডিভিডেন্ড বাদ দিয়ে উদ্বৃত্ত ও ব্যাংক ঋণ এবং অন্যান্য হিসাব যোগ করলে ইক্যুইটি বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়ানোর কথা ১ হাজার ৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অথচ ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে ইক্যুইটি বৃদ্ধি দেখানো হয়েছে মাত্র ৬৩৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ফলে ৩৬৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকার বিশাল ঘাটতি বা গরমিল রয়েছে।
কোনো সুনির্দিষ্ট খাত বা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ না করেই ‘অন্যান্য খাতে অগ্রিম’ বাবদ ২২৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা পরিশোধ দেখানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক হিসাব মান ও প্রচলিত আর্থিক নিয়মের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। বিশেষজ্ঞদের মতে, তহবিল থেকে অর্থ বের করে আত্মসাৎ করার কৌশল হিসেবেই এই ভুয়া অগ্রিম দেখানো হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায়, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে কোম্পানির মোট পাওনা ৩৯৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
এর মধ্যে শুধু বিদেশি পুনঃবীমাকারী ও সাধারণ বীমা করপোরেশনের (এসবিসি) কাছেই পাওনা ৩৯৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের শেষে এই পাওনা ছিল ৩৮৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বকেয়া বেড়েছে ১১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। মোট পাওনার মধ্যে সহ-বীমার প্রিমিয়াম বাবদ ৮১ লাখ ৬২ হাজার এবং দাবি বাবদ ২৬ লাখ ৪৭ হাজার টাকা রয়েছে।
অন্যদিকে কোম্পানিটির নিজস্ব স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ২৬৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। যমুনা, ঢাকা ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ এবং অন্যান্য মেয়াদি ঋণ মিলিয়ে এ দায় তৈরি হয়েছে। গ্রিন ডেল্টার নিজস্ব ঋণের সঙ্গে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ যোগ করলে সমন্বিত স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩২৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর বাইরে কোম্পানির ৪ কোটি ১৭ লাখ টাকার বকেয়া প্রিমিয়াম রয়েছে। এ বকেয়া মূলত সামুদ্রিক ও বিমান বীমা ব্যবসার কিস্তি বাবদ। এর মধ্যে সামুদ্রিক বীমায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ এবং বিমান বীমায় ৩৯ লাখ টাকার বকেয়া রয়েছে।
এদিকে ২০২৫ সাল শেষে গ্রিন ডেল্টার মোট বিনিয়োগ ছিল ৪০৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এই অর্থ সরকারি বন্ড, ট্রেজারি বিল, বিভিন্ন বন্ড, তালিকাভুক্ত শেয়ার, এফডিআর, অনিবন্ধিত শেয়ার ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ হিসেবে রয়েছে। শুধু তালিকাভুক্ত শেয়ারেই বিনিয়োগ ছিল ১৬২ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
বিনিয়োগ ঝুঁকির বিষয়টি নিরীক্ষকের নজরে এসেছে। ২০২৫ সালের বিবরণীতে কোম্পানির বিনিয়োগ ওঠানামা তহবিলের পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। একই সময়ে এ তহবিলে আনরিয়েলাইজড লোকসান দেখানো হয়েছে ৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
নিরীক্ষক একে গুরুত্বপূর্ণ নিরীক্ষা বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, গ্রিন ডেল্টা তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করেছে। এসব মূল্যায়নে ব্যবস্থাপনার বিচার-বিবেচনার প্রয়োজন হয় এবং বাজারমূল্যের বড় পতন হলে তা আয় ও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া কোম্পানির সম্পত্তি, প্ল্যান্ট ও সরঞ্জামের মূল্যও নিরীক্ষকের নজরদারিতে ছিল। ২০২৫ সালের শেষে এসব সম্পদের মূল্য ছিল ১২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এদিকে, বছর শেষে বকেয়া বীমা দাবির আনুমানিক দায় দেখানো হয়েছে ১৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের শেষে গ্রিন ডেল্টার সমন্বিত মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৪৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
সম্পদের বিপরীতে সমন্বিত স্বল্পমেয়াদি ঋণ ৩২৭ কোটি ৫৩ লাখ এবং পাওনা প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, যা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ। এসব বিষয়ে জানতে কোম্পানির সচিব মো. ওলিউল্লাহ খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।



