পুঁজিবাজারে রক্তক্ষরণ নিঃস্ব হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে টালমাতাল আচরণে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে বিনিয়োগকারীদের। ফলে টানা দরপতনে চলছে বিনিয়োগকারীদের রক্তক্ষরণ। আর অস্থিরবাজারে প্রায় প্রতিদিনই কমছে মূল্যসূচক। এর চেয়েও বেশি কমছে শেয়ারের দাম। আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীদের অনেকেই যে কোনো মূল্যে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বের হয়ে যেতে মরিয়া হয়ে উঠছেন। তাতে বাজারে বিক্রির চাপ বেড়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে পুঁজিবাজার যেন এক আতঙ্কের নাম। ফলে সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর ওপর ভর করে কিছুটা গতি ফিরেছিল দেশের পুঁজিবাজারে। তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন বাস্তবে না ঘটায় এখন পুঁঁজিবাজারে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। টানা দরপতনের পাশাপাশি গত দুই কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক ৮৬ পয়েন্টের বেশি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট তীব্র হচ্ছে। আবারও পুঁজি হারানোর আতঙ্ক পেয়ে বসেছে বিনিয়োগকারীদের।
ফলে দিন দিন বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে। তবে ২০২৬ সালের জুন মাসে মাসুুদ খানের নেতৃত্বে গঠিত বিএসইসির নতুন কমিশন গত ৫ মাসেও স্থিতিশীলতা ফেরাতে পারেনি পুঁজিবাজারের। ফলে মাসুদ কমিশনের উপর ক্ষোভ বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের।
ফলে পুঁজিবাজারে ধস যেন থামছে না। চলতি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইতে সূচকের বড় পতনের পর সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসেও ভয়াবহ দরপতনের মধ্যে দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। এক দিনেই প্রধান সূচক কমার পাশাপাশি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে লেনদেন ও বাজার মূলধন। ফলে যতবারই পুঁজিবাজার ধস নামে ততবারই পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের পরিবর্তনের দাবি উঠেছে।
পুঁজি হারানো এক বিনিয়োগকারী প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করে জানান, আপনি একজন ভালো যোগ্য অভিজ্ঞ লোক এখানে নিয়োগ দেন। এদিকে বিগত সময়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে খাইরুল হোসেন, শিবলী রুবাইয়াত, রাশেদ মাকসুদসহ সবারই পতন চেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। সর্বশেষ পুঁজিবাজারে ভয়াবহ দরপতনে বর্তমান মাসুদ কমিশনেরও পরিবর্তনের দাবি উঠেছে।
কালাম মিয়া নামে এক বিনিয়োগকারী বলেন, বিগত সরকার ডেকে এনেছে। আশায় এসেছিলাম। এ সরকারও ডেকে এনেছে। আশায় এসেছিলাম। আরো টাকা বিনিয়োগ করেছি। বিনিয়োগ করে আজ পর্যন্ত কোনো ভালো রেজাল্ট পেলাম না। গত দেড় মাস ধরে মার্কেটে শুধু পতন হচ্ছে। এক দিনও দেখলাম না যে ঊর্ধ্বগতি হচ্ছে। আমাদের দিকে দয়া করে আপনারা তাকান, আমাদের জন্য কিছু করেন। আর না হলে পদত্যাগ করে আপনারা এখান থেকে চলে যান।
সূচকের ভয়াবহ পতনে বিনিয়োগকারীদের অবস্থা এতটাই নাজুক যে সূচকের একেকটি পতন যেন তাদের বুকে একেকটি রক্তক্ষরণ। তাই নীতিনির্ধারণী মহলের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেই নিজেদের শান্ত করছেন বিনিয়োগকারীরা।
মনিরুজ্জামান নামে আরেক বিনিয়োগকারী বলেন, প্রত্যেকটা মানুষ কঠিন দিন কাটাচ্ছে। তাদের সব রক্ত চুষে খেয়ে ফেলেছে। আমরা কী অপরাধ করেছি, আমাদের ডেকে এনে বলে, সাত হাজার হবে, দশ হাজার হবে। অথচ মার্কেটের পরিবর্তন দেখি না। প্রতিদিনই পুঁজি হারাচ্ছি। আমার বউ আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমি বৃদ্ধ বয়সে কোথায় যাব? আত্মহত্যা করব আপনাদের জন্য? আল্লাহর কসম করে বলছি, যাদের কারণে এই মার্কেট এমন হয়েছে খোদার কসম, তাদের ওপর আল্লাহর গজব পড়ব।
দেশের শিল্পায়নের জন্য পুঁজিবাজার চাঙ্গা রাখার বিকল্প নেই। কিন্তু এমন এক অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কাছে পুঁজিবাজার বন্দি হয়ে আছে যে কোনো সিদ্ধান্ত তাদের বিরুদ্ধে গেলেই শুরু হয় সেলফ প্রেসার আর টানা পতন। আর পুঁজি হারানোর সেই পুরাতন গল্প এবং চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি।
জানা গেছে, সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের পতনে কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর ও টাকার পরিমাণে লেনদেন। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৩৭ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৪৪৫ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৯ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৭৯ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৩ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ২ হাজার ৮১ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৮৬ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৫৪ টির, দর কমেছে ২৮৪ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৪৮ টির। ডিএসইতে ৫৩৭ কোটি ১১ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৫৪২ কোটি ৯৮ লাখ টাকার ।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪৯ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৬১১ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৯৫ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানি মধ্যে ৪৯ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১২৭ টির এবং ১৯ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১৭ কোটি ১৩ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।



