দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা, অবৈধভাবে অর্থ খরচ, চেক জালিয়াতি, ভূয়া এজেন্ট, অতিরিক্ত কমিশন, বাকি ব্যবসাসহ সকল ধরনের দুর্নীতি আর অনিয়মের ফিরিস্তি চলছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সে। ফলে কোন আইনকে তারা তোয়াক্কা করছে না। এছাড়া ডামি এজেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করায় প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রনালয়।

অর্থ মন্ত্রনালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বীমা-১ শাখার উপসচিব মোহাম্মদ আবরাউল হাছান মজুমদার সাক্ষরিত এক চিঠিতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে এমন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার এক অনুসন্ধানে জান যায়, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের এজেন্ট হিসেবে নিয়োগের মাধ্যমে বিশাল অংকের কমিশন দেখিয়ে ৬৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা কোম্পানিটি থেকে কর্মকর্তারা বের করে নেয়।

তবে সেই টাকা তাদের আয়কর নথিতে দেখানো হয়েছে কি-না তা খতিয়ে দেখতে এনবিআর তদন্ত করতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এদিকে বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে একটি ‘এ’ ক্যাটাগরিতে থাকা প্রতিষ্ঠিানে যদি এমন লুটপাট হয় তাহলে আগামী দিনে গভীর সংকটে পরবে কোম্পানিটি।

জানা যায়, বীমা আইন ২০১০ এর ৪৮ ধারার অধীনে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ২০১৯ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটিতে বিশেষ নিরীক্ষা করা হয়। নিরীক্ষক শফিক মিজান রহমান এন্ড অগাস্টিনের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে এক ভয়ংকর তথ্য। জানা যায়, বীমা কোম্পানিটিতে আইডিআরএ’র লাইসেন্সধারী এজেন্ট ৩০ জন থাকলেও এর মধ্যে প্রধান কার্যালয়সহ পাঁচটি ব্রাঞ্চে মোট ৯ জন নারী এজেন্টের স্বামী কোম্পানিটির বিভিন্ন সিনিয়র পদে কর্মরত রয়েছেন।

এছাড়াও প্রধান কার্যালয়ের দু’জন কর্মকর্তা একই সাথে বেতনভুক্ত কর্মকর্তা এবং এজেন্ট হয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে তদন্তে উঠে আসে। উল্লেখ্য, কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কোম্পানিতে যে পলিসিগুলো নিয়ে আসে সেই পলিসির কমিশনের টাকা তারা আইনগত কারণে নিজেরা সরাসরি নিতে পারেনা।

কমিশনের টাকার জন্য পরিবারের সদস্যদেরকে এজেন্ট/ডামি এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স এর ৯ জন নারী এজেন্টকেও কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিস্কিয় এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং তারা ডামি এজেন্ট। এক্ষত্রে এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করার জন্য বীমা পেশা সম্পর্কে অবগত নয় এরূপ ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব মাসিক ভাড়ার ভিত্তিতে এজেন্টের কমিশনের টাকা কোম্পানি থেকে বের করার কাজে ব্যবহার করে থাকে।

তবে বীমা আইনে বলা আছে কেউ ‘কোনো ব্যক্তি বীমা এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ, নিবন্ধন ও লাইসেন্স প্রাপ্তি ও নবায়ন এর যোগ্য হইবে না যদি, তিনি কোনো বীমাকারী বা ব্রোকারের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, কর্মকর্তা বা কর্মচারী হন।’ কিন্তু প্যারামাউন্ট ইন্সুরেন্সে বীমা কোম্পানির কর্মকর্তারা এজেন্ট হিসেবে আইন লঙ্ঘন করে নিজের নামেই কমিশনের টাকা বের করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে জানা যায়, আইন অনুযায়ী বীমা কোম্পানিগুলোকে তাদের এজেন্টদের ১৫ শতাংশ কমিশন দিয়ে থাকেন। তবে নন-লাইফ বীমা খাতে বর্তমানে ১৫ শতাংশ এর অধিক (৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত) অবৈধ কমিশন দেয়ার প্রচলন রয়েছে। এর ফলে ১৫ শতাংশ কমিশন প্রদান ঠিক রেখে বাকি কমিশনের টাকা অন্যান্য খাতে দেখানোর মাধ্যমে লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে এই ১১ জন ডামি এজন্টের নামে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ডামি এজেন্টের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন যেসব কর্মকর্তা ডিএমডি ও মার্কেটিং বিভাগের প্রধান সারওয়ার খান তার স্ত্রী মারিয়া সুলতানার খানের নামে ৩ লাখ ৯৫ হাজার চারশত টাকা আত্মসাৎ করেন। হিসাব বিভাগের ডিজিএম সৈয়দ কবির হোসেন তার স্ত্রী নাসরিন ভূইয়ার নামে ১০ লাখ ৯৯ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। কাওরান বাজার শাখার মার্কেটিং বিভাগের ভিপি শামসুল আলম স্ত্রী ফারজানা ইয়াসমিনের নামে ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। একই অফিসের মার্কেটিং বিভাগের ভিপি রাশেদুল ইসলাম তার স্ত্রী মমতাজ আফরোজার নামে ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৮শত টাকা আত্মসাৎ করেন।

এদিকে, প্যারামাউন্ট ইন্সুরেন্সের বগুড়া অফিসের এসভিপি আবদুল হাই স্ত্রী মাহমুদা পারভীনের নামে ৬ লাখ ৪৮ হাজার পাচশত টাকা আত্মসাৎ করেন। একই অফিসের মার্কেটিং বিভাগের এসভিপি আশরাফ আলী মিয়াও স্ত্রী সুরভী শিরিন আশরাফী ৫৬ লাখ ৫১ হাজার চারশত টাকা আত্মসাৎ করেন।

কুষ্টিয়া শাখার আসের আলী স্ত্রী নূরুন নাহার বেগমের নামে ৪ লাখ ৩৬ হাজার সাতশত ও শামীমা বেগমের নামে তার স্বামী যশোর শাখার মোহাম্মদ উল্লাহ এক লাখ ৭৬ হাজার তিনশত টাকা আত্মসাৎ করেন। নওগা শাখার আজিজুল ইসলাম স্ত্রী সুমাইয়া আকতারের নামে ৪ লাখ ৪৯ হাজার পাচশতটাকা আত্মসাৎ করেন। তবে চট্টগ্রামের মো: হুমায়ুন আহমেদ ও সৈয়দ হাসান মাহমুদ নিজে চাকুরি করেন এবং এজেন্ট হিসেবে ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং ৫৯ হাজর ৪ শত টাকা আত্মসাৎ করেন।

প্রতিবেদনে উঠে আসে এভাবে বীমা কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা এজন্টের নামে অতিরিক্ত কমিশন বের করার কারনে ইন্সুরেন্সের আর্থিক অবস্থার দিন দিন অবনতি হচ্ছে। তবে তদন্তকারী গোয়েন্দা সংস্থার সুপারিশ হলো প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সসহ অন্যান্য সকল নন-লাইফ বীমা কোম্পানিতে ডামি এজেন্টের নামে কমিশন প্রদান বন্ধের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আইডিআরএ’কে সুপারিশ প্রদান করতে হবে। প্যারামাউন্টের ১১ (এগারো) জন ডামি এজেন্ট ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ সকল নন-লাইফ বীমা কোম্পানির এজেন্টের আত্মসাতকৃত টাকা আয়কর নথিতে দেখানো হয়েছে কিনা তা তদন্তের মাধ্যমে এনবিআর ব্যাবস্থা নিতে পারে।

১৯৯৯ সালে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স ৬০ কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও কার্যক্রম শুরু করে এবং ২০২৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধিত মূলধনের পরিমান ৪০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ৪ কোটি ৬ লাখ ৬৪ হাজার ৯৬৬ টি। ২০২৫ সালের ৩০ জুন প্রর্যন্ত কোম্পানিটিতে উদ্যোক্তা পরিচালকদের ধারণকৃত শেয়ার আছে ৪৮.৪৮ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার ২০.০৪ শতাংশ, বিদেশী শেয়ার ০.০৪ শতাংশ এবং পাবলিক ৩১.৪৪ শতাংশ রয়েছে।