চার বছর লভ্যাংশ বঞ্চিত আনলিমা ইয়ার্নের শেয়ারহোল্ডারা
ইমান হোসাইন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানি আনলিমা ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড কয়েক বছর ধরে ভালো ব্যবসা করতে পারছে না। আর্থিকভাবে দুরবস্থায় পড়েছে কোম্পানিটি। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। ফলে গত চার বছর ধরে লভ্যাশ থেকে বঞ্চিত থেকে শেয়ারহোল্ডারা। সর্বশেষ ২০২১ সালে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। তবে কোম্পানিটির ইতিহাসে বোনাস লভ্যাংশ দেওয়ার নজির নেই।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে আনলিমা ইয়ার্ন ডায়িংয়ের বিদ্যমান মোট সম্পদের চেয়েও দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকার বেশি। এতে কোম্পানিটি ভবিষ্যতে তার কার্যক্রম পরিচালন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে নিরীক্ষক। তবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বিদ্যমান সমাস্যাগুলো সমাধান করতে উদ্যোগ নিয়েছে।
নিরীক্ষকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে আনলিমা ইয়ার্নের সংরক্ষিত মুনাফা তহবিলে (রিটেইনড আর্নিংস) ঘাটতি পড়েছে আট কোটি ৬২ লাখ টাকা। এছাড়া চলতি অর্থবছর কোম্পানিটির বিদ্যমান মোট সম্পদের (কারেন্ট অ্যাসেট) চেয়ে দায়ের পরিমাণ ৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বেশি দাঁড়িয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে কোম্পানিটি তার কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে নিরীক্ষক। কোম্পানিটি এখনও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানির মোট সম্পদের পরিমাণ ৩৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিদ্যমান সম্পদের (কারেন্ট অ্যাসেট) পরিমাণ ১৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা। নিরীক্ষক বলছে, কোম্পানির এই বিদ্যমান সম্পদের চেয়ে দায় ৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বেশি।
তবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা খুব শিগগিরই তাদের ব্যবসা পুরোদমে চালিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। কোম্পানির আর্থিক অবস্থা এবং কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা এবং কৌশল নেয়া হয়েছে। তারা তাদের উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য যোগাযোগ করছে। উৎপাদন খরচ কমাতেও তারা বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
কোম্পানি কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, তারা পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বৃদ্ধি এবং তাদের ইউনিটগুলোর বিক্রির পরিমাণ বাড়াবে। রপ্তানি আদেশ বৃদ্ধির জন্যও কাজ করবে। এর মাধ্যমে শিগগিরই নেতিবাচক ধারা থেকে বেরিয়ে আসবে এবং দায়গুলোকে অতিক্রম করে বর্তমান সম্পদের পরিমাণ শক্তিশালী করবে।
এদিকে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে কোম্পানির সংরক্ষিত মুনাফা তহবিলে আরও এক কোটি ৩০ লাখ টাকা ঘাটতি বেড়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে সংরক্ষিত মুনাফা তহবিলে মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
যদিও আলোচ্য তিন মাসে কোম্পানির বিক্রি বাবদ আয় বেড়েছে কোটি টাকার বেশি। গত জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে কোম্পানির বিক্রি বাবদ মোট আয় হয়েছে তিন কোটি ৫৫ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে যা হয়েছিল দুই কোটি ২৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে কোম্পানির তিন মাসে বিক্রি বাবদ আয় বেড়েছে এক কোটি ৩১ লাখ টাকা।
আয় বাড়ায় আলোচিত তিন মাসে কোম্পানির লোকসানের পরিমাণও কিছুটা কমেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে কোম্পানির নিট লোকসান হয়েছে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এই লোকসান হয়েছিল এক কোটি ৬১ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে কোম্পানির তিন মাসের লোকসান কমেছে ৩১ লাখ টাকা।
কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত পাঁচটি অর্থবছরের মধ্যে ৩ অর্থবছরেই কোম্পানির লোকসান হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির নিট লোকসান হয়েছে পাঁচ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। আগের বছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল তিন কোটি ২২ লাখ টাকা। তারও আগের বছরে মাত্র ১৪ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে নিট লোকসান হয়েছিল ৩৩ লাখ টাকা। তার আগের বছরে মাত্র আট লাখ টাকা মুনাফা হয়েছিল।
১৯৯৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া আনলিমা ইয়ার্ন ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের আগে কোম্পানিটি ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের এ কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন রয়েছে ১৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা এক কোটি ৭৮ লাখ ৬৭ হাজার ৮০০। এর মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি মালিকানা রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। অর্থাৎ কোম্পানিটি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির পরিমাণ বেশি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আনলিমা ইয়ার্ন আনলিমা গ্রুপের একটি কৌশলগত ইউনিট, যাদের টেক্সটাইল, ইয়ার্ন ডাইং, সেলাই সুতা, রিয়েল এস্টেট ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেও বিনিয়োগ রয়েছে।



