বিএসইসির বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পুঁজিবাজার
শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: টানা দরপতনে পুঁজিবাজার, ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বিনিয়োগকারীরা। ফলে দিন যতই যাচ্ছে পুঁজিবাজারের হাহাকার ততই বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ মানেই লোকসান। যার ফলে পুঁজিবাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমনকি পুঁজিবাজার থেকে নীরবে প্রস্থান করছেন হাজারো বিনিয়োগকারী। দীর্ঘমেয়াদি মন্দা, আস্থার সংকট এবং ভালো শেয়ারের অভাবে গত ১৪ মাসেই পুঁজিবাজার ছেড়েছেন বা নিস্কিয় হয়ে পড়েছেন ৬২ হাজারের বেশি বিনিয়োগকারী।
‘অদ্ভুত’ এমন পুঁজিবাজার ৩০ বছরের ইতিহাসে দেখিনি যায়নি বলে বিনিয়োগকারীদের আর্তনাদ বেড়েছে। তাছাড়া রাশেদ মাকসুদ কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার ১৪ মাস অতিবাহিত হলেও এখন আস্থা ফেরাতে পারেনি পুঁজিবাজার। বরং আস্থা বিনিয়োগকারীদের যেটুকু ছিল তাও সংকটে পড়েছে। ফলে দিন দিন বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে।
ফলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনের ওপর আস্থা পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। গত বছরের ১৮ আগস্ট চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক কমেছে ৮৮৩ পয়েন্ট। মুলত রাশেদ মাকসুদ কমিশন যখন দায়িত্ব নেয় তখন ডিএসই সূচক ছিলো ৫৭৭৮.৬৩ পয়েন্ট।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক এসে দাঁড়িয়েছে ৪৮৯৯.০১ পয়েন্ট। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়ে গেছে এবং বাজারে ক্রেতার অভাব দেখা দিয়েছে। কিছু কিছু কোম্পানির শেয়ার বড় বিনিয়োগকারীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে সেল প্রেসার দিয়ে নিচে নামিয়ে ফেলছেন বলে বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করেছেন।
এছাড়া বর্তমান পুঁজিবাজার ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ করছেন বিনিয়োগকারীরা। আর সেই অভিযোগের তীর সরাসরি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর দিকে। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, ডিভিডেন্ড মৌসুমে বাজার ঘুরে না দাঁড়িয়ে ধারাবাহিক দরপতন চলছে। বিএসইসি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ না নিয়ে একের পর এক বিনিয়োগকারীদের স্বার্থবিরোধী বিতর্কিত পদক্ষেপ ও নির্দেশনা জারি করছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বছরের শুরু থেকেই বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছিল এবং সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা একটা স্থিতিশীল পর্যায়ে চলে এসেছিল। সূচক ও লেনদেনও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছিল, এতে সকল শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও বাড়ছিল। সেপ্টেম্বরে এনবিআর এর বিতর্কিত বিনিয়োগ সংক্রান্ত চিঠি ইস্যুর কারণে বাজার পড়তে থাকে। এরপর নানা সমালোচনার পর সেই অবস্থা থেকে আবারও বাজার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল।
কিন্তু এরপর বিএসইসি’র একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাজারের প্রতি আস্থা সঙ্কট তৈরি হয়। বিএসইসি’র সর্বশেষ মার্জিন ঋণের ইস্যু বাজারের জন্য আরও মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে।
একাধিক বিনিয়োগকারীদের মতে, মার্জিন ঋণ ইস্যুতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের, বিশেষ করে ৫ লাখ টাকার নিচে যাদের বিনিয়োগ রয়েছে, তাদের স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করা হয়েছে। বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সকল শ্রেণীর বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ অতীব জরুরী, কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেদিকে যাচ্ছেই না। তারা বাজারকে ধ্বংসের জন্য যত পদক্ষেপ রয়েছে তার সবই প্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের।
বিনিয়োগকারীরা অভিযোগের সুরে বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্তরা ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হওয়ায় তারা পুঁজিবাজারকে ধ্বংস করতে চাইছে। তাই সাধারণ বিনিয়োকারীদের স্বার্থবিরোধী একের পর এক নির্দেশনা জারি করছে, যাতে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়। তারা হুঁশিয়ারি দেন, যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে তবে বিনিয়োগকারীরা কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন। পুঁজিবাজারকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় বিএসইসিতে কর্মরত ফ্যাসিস্ট সরকারের সকল দোসরদের অপসারণ করা জরুরি বলে মনে করেন তারা।
জানা গেছে, সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন সূচকের সাথে কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর ও টাকার পরিমাণে লেনদেন। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৬৮ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৪ হাজার ৮৯৯ পয়েন্টে।
আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১৬ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ২২ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ১১ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৯২৮ পয়েন্টে। দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯০ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৩৪ টির, দর কমেছে ৩২৯ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ২৭ টির। ডিএসইতে ৪০২ কোটি ২০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ১৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৪১৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকার।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৭৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৮৮৩ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৫৫ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৪২ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১০৯ টির এবং ৪ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ২২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।



