আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় পুঁজিবাজারকে। অর্থনীতির অগ্রগতির ধারাকেও তরান্বিত করে পুঁজিবাজার। তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের চিত্র ভিন্ন রকম। দেশের অর্থনীতি এগিয়ে গেলেও পুঁজিবাজার তার তুলনায় অনেক দূর্বল। মুলত পুঁজিবাজারের অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে দায়ী করা হয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হঠকারী সিদ্ধান্তকে।

মুলত সম্প্রতি পুঁজিবাজার দরপতনের পেছনে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মার্জিন ঋণ ইস্যু ও পাঁচ ব্যাংক ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের হঠকারী সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এছাড়া টানা দরপতনের সঙ্গে লেনদেন খরা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন লেনদেনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমছে। অব্যাহত পতনের মধ্যে পড়ে মূল্যসূচক এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে চলে এসেছে। আর লেনদেন কমতে কমতে ৩০০ কোটি টাকার নিচে নেমেছে।

ফলে বলতে গেলে পুঁজিবাজারটি একেবারেই সরকারের মনোযোগের বাইরে। দীর্ঘদিনের জঞ্জাল সরিয়ে একটি স্থিতিশীল ও আস্থার বাজারে পরিণত করার আন্তরিক প্রচেষ্টা অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দেখা যায়নি। এছাড়া বিনিয়োগকারীরা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের হস্তক্ষোপ কামনা করছেন।

তাছাড়া টানা দরপতনে প্রতিদিনই লেনদেন ও সূচক কমেছে। ফলে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চিত পুঁজিবাজারে সূচকের ‘কফিনে আরেকটি পেড়েক’ বসল। এদিন সূচকের পতন হয়েছে ৪৭ পয়েন্ট। টানা দরপতনে বিনিয়োগকারীরা ফোর্স সেল আতঙ্কে ভুগছেন। এমনকি কিছু কিছু ব্রোকারেজ হাউজ ফোর্স সেল শুরু করছেন।

তবে ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও ব্যতিক্রম শুধু পুঁজিবাজার। প্রশ্ন উঠছে সব খাতে সংস্কারের পর ঘুরে দাঁড়ালেও পুঁজিবাজার কেন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না এ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। এছাড়া গত ১৪ মাসে পুঁজিবাজারের বৃদ্ধি তো দূরের কথা, উল্টো প্রতিদিনই কমছে মূল্যসূচক ও বাজার মূলধন।

ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিললেও পুঁজিবাজার চলছে সেই পুরানো উল্টো পথে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৪ মাস পুঁজিবাজারের কোন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বারবার আস্থার সংকট, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এছাড়া দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোন অবদান রাখতে পারছে না পুঁজিবাজার। তেমনি বিএসইসির অদক্ষ্য ও অযোগ্য কমিশনের কারণে বেহাল দশা দেশের পুঁজিবাজারের। সার্বিকভাবে বর্তমানে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে ভাটা চলছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফা কমছে। নতুন করে কোনো কোম্পানির তালিকাভুক্তি হচ্ছে না। এছাড়া পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণও কমছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার নিয়ে আশাবাদী হতে পারছেন না।

ফলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনের ওপর আস্থা পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। গত বছরের ১৮ আগস্ট চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক কমেছে ৯৫৩ পয়েন্ট। মুলত রাশেদ মাকসুদ কমিশন যখন দায়িত্ব নেয় তখন ডিএসই সূচক ছিলো ৫৭৭৮.৬৩ পয়েন্ট।

সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক এসে দাঁড়িয়েছে ৪৮২৫.৩৩ পয়েন্ট। আর দৈনিক লেনদেনের ধীর গতিতে সন্তুষ্ট হতে পারছে না বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া কমিশন সংক্রান্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে বিনিয়োগকারীদের মনে তৈরি করেছে আস্থার সংকট। অন্যদিকে কোন বিনিয়োগকারী বেশী পরিমাণ শেয়ার কিনলেই বিএসইসি থেকে ফোন দিয়ে কারণ জানতে চাওয়া হয়।

জানা গেছে, সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন সূচকের সাথে কমেছে টাকার পরিমাণে লেনদেন ও বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৪৫ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৪ হাজার ৮২৫ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১১ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৫ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ১৮ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৮৯৮ পয়েন্টে।

দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৮৮ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৫৩ টির, দর কমেছে ৩০১ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৪ টির। ডিএসইতে ২৯০ কোটি ১৩ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৪৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৩৩৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকার।

অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১২০ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৬১৭ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৬৫ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৩২ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১২০ টির এবং ১৩ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।