বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগ ঘিরে গুঞ্জন, কে হচ্ছেন নতুন চেয়ারম্যান
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনের ওপর আস্থা পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ১৫ মাস অতিবাহিত হলেও এখন আস্থা ফেরাতে পারেনি পুঁজিবাজার। বরং দিন যতই যাচ্ছে বিনিয়োগকারী কমেছে পুঁজিবাজারে। ফলে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক দরপতনের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনকে ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন বিনিয়োগকারীরা।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, কমিশনের অদক্ষতার কারণে বাজারে ব্যাপক দরপতন ঘটেছে, যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ বিনিয়োগকারী তাদের পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। এ অবস্থায় বর্তমান কমিশনের অপসারণ দাবি করেছেন তারা। এছাড়া বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে পদত্যাগের জন্য চার দিনের সময় বেঁধে দিয়েছে বিনিয়োগকারীদের ১০ সংগঠনের জোট।
গত বছরের ১৮ আগস্ট চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক কমেছে ১০৭৬ পয়েন্ট। মুলত রাশেদ মাকসুদ কমিশন যখন দায়িত্ব নেয় তখন ডিএসই সূচক ছিলো ৫৭৭৮.৬৩ পয়েন্ট। গত সপ্তাহে সর্বশেষ দরপতনে ডিএসইর সূচক এসে দাঁড়িয়েছিল ৪৭০২.৬৮ পয়েন্ট। আর দৈনিক লেনদেনের ধীর গতিতে সন্তুষ্ট হতে পারছে না বিনিয়োগকারীরা।
এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা কী ভাবে পুঁজি টিকিয়ে রাখবেন তা নিয়ে হা হুতাশ বাড়ছে। ফলে কোন ক্রমেই দরপতনের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না পুঁজিবাজার। একই সঙ্গে কাটছে না লেনদেনের খরা। কমছে লেনদেন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও টাকার পরিমাণ। পরিস্থিতি এমন হয়েছে, এক সময়ের দৈনিক তিন হাজার কোটি টাকার লেনদেনের বাজার, এখন ২০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
মুলত পুঁজিবাজার ইস্যুতে বিএসইসি চেয়ারম্যানের হুটহাট সিদ্ধান্ত ও মার্জিন ইস্যুতে হঠকারী সিদ্ধান্ত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরের পুঁজিবাজার তালিকাভুক্ত পাঁচ ব্যাংক ইস্যুতে বির্তকিত সিদ্ধান্তের ফলে আস্থা সংকটে বাজারবিমুখ হয়ে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া বিনিয়োগকারীরা লোকসানে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন। তবে বাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখাই প্রধান দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কিন্তু কমিশন ঘুমিয়ে আছে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখার কোনো দায় নেই বিএসইসির।
মুলত ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও ব্যতিক্রম শুধু পুঁজিবাজার। গত ১৫ মাসে পুঁজিবাজারের বৃদ্ধি তো দূরের কথা, উল্টো প্রতিদিনই কমছে মূল্যসূচক ও বাজার মূলধন। ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিললেও পুঁজিবাজার চলছে সেই পুরানো উল্টো পথে।
ফলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৪ মাস পুঁজিবাজারের কোন উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বারবার আস্থার সংকট, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া দেশের অর্থনীতিতে তেমন কোন অবদান রাখতে পারছে না পুঁজিবাজার। বিনিয়োগকারীরা মনে করে বিএসইসির অদক্ষ্য ও অযোগ্য কমিশনের কারণে বেহাল দশা দেশের পুঁজিবাজারের।
এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল না করে সংস্কারের নামে একের এক এক কির্তকিত সিদ্ধান্তে বাজারকে অস্থিতিশীল করছেন। ফলে ক্রমান্বয়ে পুঁজিবাজার ডুবতে বসেছে। স্পর্শকাতর এই খাতটির সঙ্গে লাখ লাখ বিনিয়োগকারীদের সরাসরি বিনিয়োগ জড়িত, প্রতিদিনের লেনেদেনের প্রতিফলন ঘটে সূচক উঠা-নামার মাধ্যমে, ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়াটিও সূচকের সমান্তরাল রেখায় প্রতিফলিত হয়। সূচক ও লেনদেন তলানিতে নামছে, যেন দেখার কেউ নেই।
বিএসইসি চেয়ারম্যান দায়িত্বগ্রহনের সময় বলেছেন পুঁজিবাজারে ৫০ লাখ বিনিয়োগকারী আসবে। সেখানে প্রতিনিয়ত কমেছে বিনিয়োগকারী যা বর্তমানে ১৫ লাখে এসে দাঁড়িয়েছে। দেশের অর্থনীতি কিংবা শিল্পে অবদান রাখা তো দূরের কথা সাধারণ ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরাও এখন বিপর্যস্ত এবং হতাশাগ্রস্থ। উপায়ান্তু না পেয়ে বিনিয়োগকারীরা কখনো কফিন মিছিল আবার কখনো কাফন মিছিলও করেছে। কিন্তু কোন কিছুতেই পুঁজিবাজারের সমস্যার সমাধান মেলেনি।
মুলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে চেয়ারম্যান বানিয়ে গত ১৫ বছর মার্কেট পরিচালনা করে কোন লাভ তো হয়নি বরং ভেঙে পড়েছে মার্কেটের ভিত্তি স্তর। এরপর ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নিলে পুঁজিবাজারের ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। দিনের পর দিন বাড়ছে জেড ক্যাটাগরির শেয়ার। এসময় তিনি কোম্পানির পরিচালকদের শাস্তি না দিয়ে দুর্বল কোম্পানিগুলো তালিকাচ্যুত করার পরিকল্পনা করছেন। ফলে বিনিয়োগকারীরা নি:স্ব থেকে নি:স্বতর হচ্ছে।
এমনকি লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিও শূন্যে নেমে গেছে। এ অবস্থায় সবার মুখে একটাই কথা বিএসইসি চেয়ারম্যান পদত্যাগ না করলে পুঁজিবাজার স্বাভাবিক হবে না। তবে বিএসইসি চেয়ারম্যান পদত্যাগ করলে কোন হচ্ছেন বিএসইসির পরবর্তী চেয়ারম্যান এ প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে।
এখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছেন সকল বাহিনী ও প্রশাসনের ব্যক্তিবর্গ সেই সাথে আছে শিক্ষকসহ সকল পেশাজীবীর মানুষ। এতদসত্ত্বেও রাষ্ট্রযন্ত্র কিংবা দায়িত্বশীল কারো যেখানে টনক নরেনি বিন্দু মাত্র, দায়িত্বশীলতা এখানে সুদূর পরাহত।
এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর চেয়ারম্যান পরিবর্তনের দাবির প্রেক্ষিতে কিছুটা গুঞ্জন পাওয়া যাচ্ছে চেয়ারম্যান পরিবর্তনের। সেই সাথে শোনা যাচ্ছে নতুন সম্ভাব্য চেয়ারম্যানদের নাম। সেই সম্ভাব্য তালিকায় আবারো শোনা যাচ্ছে শিক্ষকদের নাম যদিও তালিকার মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়ী এবং সেনা কর্মকর্তার নাম।
একাধিক বিনিয়োগকারীর সাথে আলাপকালে বলেন, বর্তমান পুঁজিবাজারে মূল সমস্যা আস্থা সংকট। বিশেষ করে বিএসইসি চেয়ারম্যানের বিতর্কিত কর্মকান্ডে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগের বিকল্প নেই। এ অবস্থায় বিএসইসি নতুন চেয়ারম্যান আসলে পুঁজিবাজার গতিশীল করতে হবে বলে তারা মনে করেন।



