শহীদুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ব্যাংক খাতে লাগামহীনভাবে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ঝুঁকিপূর্ণ এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ২৬টি ব্যাংক। এসব ব্যাংক প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে পারেনি। ফলে এই ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাত্র ছয় মাসেই পুরো খাতে প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। দেশীয় ৫২টি ব্যাংকের মধ্যে ২৬টি নিয়ম অনুযায়ী খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি কয়েকটি বেসরকারি ও শরিয়াহ ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলক বেশি, সেগুলোর আর্থিক অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে গত দেড় দশকে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তার বেশির ভাগই এখন আর ফেরত আসছে না। এর প্রভাবে সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। তাদের মতে, প্রভিশন ঘাটতির মূল কারণ হলো খেলাপি ঋণ আদায়ে দুর্বলতা, বড় ঋণ গ্রহীতাদের প্রতি অতিরিক্ত ছাড় এবং নিয়মিত পুনঃতফসিল ও অবলোপনের সংস্কৃতি। এভাবে প্রভিশন ঘাটতি বাড়তে থাকলে তা শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদের আস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

ব্যাংক খাতকে টেকসই করতে হলে খেলাপি ঋণ কমানো, শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করা এবং পরিচালন পর্ষদের জবাবদিহি বাড়ানো জরুরি বলেও মত দেন তারা। খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণও বাড়বে। আর এ সময় যেসব ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না।

এই প্রসঙ্গে অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল আমিন বলেন, ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশনের পরিমাণ বাড়ে। এটা যদি মুনাফা থেকে মেটানো না যায়, তাহলে মূলধনের ওপর প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ মূলধন কমে যায়। তখন ব্যাংকের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো ডিভিডেন্ড দিতে পারে না। ফলে বাজারে শেয়ারের দাম কমে যায়। নিয়ম অনুযায়ী, সব ধরনের ব্যাংক যেসব ঋণ দেয় তার গুণমান বিবেচনায় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রভিশন হিসেবে জমা রাখতে হয়।

কোনো ঋণ শেষ পর্যন্ত মন্দ ঋণে পরিণত হলে তাতে যেন ব্যাংক আর্থিকভাবে ঝুঁকিতে না পড়ে, সেজন্য এ প্রভিশন সংরক্ষণের নিয়ম রাখা হয়েছে। ব্যাংকের অশ্রেণিকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে ৫ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হয়। নিম্ন বা সাব-স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে রাখতে হয় ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ২৬টি ব্যাংক প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি, বেসরকারি ২০ ও বিশেষায়িত একটি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। এ সময় বেশ কয়েকটি ব্যাংকের উদ্বৃত্ত থাকায় সার্বিক ব্যাংক খাতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। গত মার্চে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি ছিল মাত্র ১ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা।

ফলে ছয় মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময় সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। এ খাতের ২০টি ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭১ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা। এ সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি হয়েছে ৭৮ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। বিশেষায়িত একটি ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতি হয়েছে ২৫৯ কোটি টাকা। তবে বিদেশি খাতের ৯টি ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতি হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে সর্বোচ্চ প্রভিশন ঘাটতি হয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের। ব্যাংকটির ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮২ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি হয়েছে একীভূত হওয়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৫২ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ৪৮ হাজার ৩১ কোটি টাকা। এ ছাড়া একীভূত হওয়া এক্সিম ব্যাংকের ঘাটতি ২৩ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা,

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২১ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ১৫ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৪ হাজার ২৮২ কোটি টাকা, আইএফআইসির ১৯ হাজার ৫০ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১০ হাজার ৪৮ কোটি টাকা, রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ১৩ হাজার ৭৩ কোটি টাকা ও অগ্রণী ব্যাংকের ১১ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা।

একইভাবে বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা, ইউসিবি ব্যাংকের ৪ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ২ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ১ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা, এনআরবিসি ব্যাংকের ১ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, এবি ব্যাংকের ১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা, সাউথইস্ট ব্যাংকের ১ হাজার ১২৫ কোটি টাকা, ঢাকা ব্যাংকের ৬৩৬ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৬১৫ কোটি টাকা,

এনআরবি ব্যাংকের ২৭০ কোটি টাকা, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ২৩৯ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ৪০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ও এনসিসি ব্যাংকের ৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা।