ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯৪ হাজার কোটি টাকা
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি ২০২৫ সালে ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত অর্থবছরে নো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। এর আগে ২০২৪ সালের সমাপ্ত বছরের জন্যও ব্যাংকটি শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। ফলে ধারাবাহিক মুনাফা করেও খেলাপি ঋণের বোঝার কারণে এ ক্যাটাগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে। মুলত খেলাপির পরিমাণ মোট ঋণের ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় পরপর দুই বছর লভ্যাংশ দিতে পারেনি শরিয়াভিত্তিক এই ব্যাংকটি।
এদিকে ইসলামী ব্যাংকে ঋণের নামে গ্রাহকদের আমানতের বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা সামনে এসেছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের মাধ্যমে দেওয়া ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এতে করে ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে ব্যাংকটির গ্রাহকদের আমানত। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ (ঋণ) দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, যা মোট বিনিয়োগের অর্ধেকেরও বেশি। এই বিপুল খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকটির প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি (প্রভিশন) হওয়া উচিত ছিল ৮৮ হাজার ৮৯৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকটি সঞ্চিতি গঠন করেছে মাত্র ৫ হাজার ৮৮৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ফলে শুধুমাত্র এই খাতেই সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার ১১ কোটি ৩ লাখ টাকা।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ ও অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে মোট প্রয়োজনীয় সঞ্চিতির দরকার ছিল ৯২ হাজার ৫৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটি সঞ্চিতি গঠন করেছে মাত্র ৭ হাজার ৯২২ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
ফলে বিনিয়োগ ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রে মোট সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এই বিপুল সঞ্চিতি ঘাটতি স্বীকৃতি না দেওয়ায় ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণীতে সম্পদ, নিট মুনাফা ও ইক্যুইটি অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং একই সঙ্গে দায় কম দেখানো হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংকটির অপর্যাপ্ত মুনাফার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তীতে এই সঞ্চিতি গঠনের সুযোগ দিলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের ছাড় আন্তর্জাতিক হিসাব মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ ভবিষ্যতে এই বিশাল অঙ্কের সঞ্চিতি একসঙ্গে গঠন করতেই হবে, যার প্রকৃত প্রভাব বর্তমান আর্থিক বিবরণীতে প্রতিফলিত হয়নি। এতে করে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বিষয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছেন, যা এক ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্পমেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণের দুর্বল সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংক দখল করে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানে ঋণ বিতরণের কারণেই ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক আজ গভীর সংকটে পড়েছে। এর ফল ভোগ করছেন সাধারণ আমানতকারীরা, এখন নিজেদের জমানো অর্থ ফেরত পেতে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।
২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাববছরে ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয় ব্যাংকটি। ওই হিসাববছরে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা হয় ৩ টাকা ৯৫ পয়সা যা আগের হিসাববছর ছিল ৩ টাকা ৮৩ পয়সা। এ সময় ব্যাংকটির এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ৪৫ টাকা ২৪ পয়সা।
২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাববছরও ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয় ইসলামী ব্যাংক। এ সময় ব্যাংকটির ইপিএস হয় ৩ টাকা ৮৩ পয়সা যা আগের হিসাববছর ছিল ২ টাকা ৯৯ পয়সা। ওই হিসাববছর শেষে ব্যাংকটির এনএভিপিএস দাঁড়ায় ৪৩ টাকা ২১ পয়সা।
২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাববছরে ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক। আলোচ্য হিসাববছরে ব্যাংকটির ইপিএস হয়েছে ২ টাকা ৯৯ পয়সা যা আগের হিসাববছরে ছিল ২ টাকা ৯৮ পয়সা। ওই হিসাববছর শেষে ব্যাংকটির এনএভিপিএস দাঁড়ায় ৪০ টাকা ৮২ পয়সা।
১৯৮৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইসলামী ব্যাংকের মোট শেয়ারসংখ্যা ১৬০ কোটি ৯৯ লাখ ৯ হাজার ৬৬৮। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ রয়েছে পরিচালকদের হাতে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে আছে ৭৫ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ শেয়ার। বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে যথাক্রমে ১৭ দশমিক ৯১ এবং ৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ।



