৫ ব্যাংক একীভূতকরণ ইস্যুতে বছরজুড়ে আমানতকারীদের হাহাকার
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ২০২৫ সালে ব্যাংক খাতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠে এসেছে দুর্বল ৫ ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণের বিষয়। এসব ব্যাংকের সম্মতি না থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক এই উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের পর ৫ ব্যাংক একীভূত করে নবগঠিত ব্যাংকের নাম রাখা হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী এবং ইউনিয়ন ব্যাংক এই পাঁচ শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে গত ২ ডিসেম্বর।
এদিকে ২০২৫ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আমানত বিমা তহবিল আইনও সংশোধন করা হয়েছে। ফলে এখন থেকে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়ন হলে সাধারণ আমানতকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা ফেরত পাবেন। যদিও বছরের শেষ পর্যায়ে এসেও আমানতকারীরা তাদের গচ্ছিত সঞ্চয়ের এক টাকাও ফেরত পাননি। বছরজুড়েই নিজেদের জমানো অর্থ ফেরতের আশায় ছিলেন পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা। একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই এসব ব্যাংক থেকে কোনো টাকা তুলতে পারছেন না গ্রাহকরা। তারা তাদের প্রয়োজনে কষ্টার্জিত সঞ্চয় তুলতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এর আাগে, বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে এই ৫টি ব্যাংক দুর্বল। এরপরই এই ব্যাংকগুলো থেকে আমানত উত্তোলনের চাপ বাড়ে। ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দেয়। একীভূতকরণের উদ্যোগের পর টাকা ফেরত দেওয়া একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনেও অর্থ না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন অসংখ্য আমানতকারী। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার আশ্বাস দিলেও দ্রুত সমাধান না হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ ও আস্থাহীনতা বাড়তে থাকে।
জরুরি প্রয়োজনেও তারা নিজেদের হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন করতে না পেরে ধার-দেনা করে চলতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। তাদের মতে, চিকিৎসা, বিয়ে, সন্তানের পড়াশোনাসহ জরুরি কাজের জন্যই আমরা অনেক কষ্ট করে ব্যাংকে টাকা জমিয়েছিলাম। কিন্তু প্রয়োজনের সময়ও টাকা ফেরত পাচ্ছি না।
এ প্রসঙ্গে ইউনিয়ন ব্যাংকের গ্রাহক আলিফ রেজা বলেন, একীভূত হওয়া ব্যাংকে আমাদের কষ্টার্জিত অর্থ জমা রেখেছি। কিন্তু সেই টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় আমরা আজ পথে পথে ঘুরছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বারবার কথা দিলেও তা রাখতে পারছেন না। আমাদেরও ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।
সর্বশেষ গভর্নর জানান, সব ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ডিসেম্বরের মধ্যেই এই পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। যদিও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। গ্রাহকরা কবে টাকা ফেরত পাবেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার সব কাজ প্রায় সম্পন্ন করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে। চলতি মাসেই গ্রাহকরা নতুন ব্যাংক থেকে টাকা ফেরত পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
গ্রাহকের টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আয়ুব মিয়া বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের আমানত বিমা তহবিলের টাকা ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। যেহেতু গ্রাহকদের নতুন ব্যাংকের অধীনেই অর্থ দিতে হবে, তাই সবার নামে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। পাঁচ ব্যাংকের পুরোনো অ্যাকাউন্টগুলোও একীভূত করতে হবে এবং শাখাভিত্তিক অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এসব কারণে সময় লাগছে। তবুও ডিসেম্বরের মধ্যেই গ্রাহকরা টাকা পেয়ে যাবেন বলে আশা করি।
এদিকে জোরপূর্বক ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। অনেকের মতে, দুর্বল ব্যাংকের দায় শক্তিশালী ব্যাংকের ওপর চাপিয়ে দিলে পুরো খাত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দাবি, বিকল্প পথ না থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে, সবগুলোই দুর্বল ব্যাংক। এগুলো একীভূত করলেই যে সেটি সবল হবে, তার কোনো মানে নেই। ব্যাংকগুলোর মূল যেসব সমস্যা আছে সেগুলো দূর করার উদ্যোগ না নেওয়া হলে ৫টি, ১০টি বা ৫০টি ব্যাংক একত্রিত করলেও কোনো লাভ হবে না। এ জন্য মূল সমস্যার সমাধান করতে হবে।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সেগুলোকে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। মূল সমস্যার মধ্যে রয়েছে খেলাপি ঋণ দূরীকরণ। এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, আমানতকারীদের সুরক্ষার কথা বলা হলেও বর্তমানে তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংককে অতি দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করার আহবান জানান তিনি।
এ ছাড়া ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর ৫ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ব্যাংক একীভূতকরণের তিন বছরের মধ্যে কারও চাকরি যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন আশ্বাসেও দুর্বল ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আতঙ্ক কাটছে না। কারণ ইতোমধ্যে এসব ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ২০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও একীভূতকরণ নীতিমালায় এমন কোনো কথা ছিল না।
নতুন বছরের শুরুতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে। এটি হচ্ছে দেশের সরকারি মালিকানাধীন সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংক। যার পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ইতোমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বাজেট থেকে দিয়েছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের আমানত বিমা তহবিল থেকে দেওয়া হবে। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ধরা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের শেয়ার শূন্য করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর প্রকৃত সম্পদের মূল্য ঋণাত্মক হওয়ায় ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের আওতায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচটি ব্যাংকে বর্তমানে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। বিপরীতে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশই খেলাপি হয়ে গেছে।



