আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বিগত সরকারের আমলে পুঁজিবাজারে সক্রিয় একটি গোষ্ঠী পুঁজিবাজারে কৃত্রিম ওঠানামার মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে। তাদের সূক্ষ্ম কারসাজির ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন অসংখ্য সাধারণ বিনিয়োগকারী। এসব ঘটনায় তৎকালীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কার্যত কোনো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে দায়সারা তদন্ত ও নামমাত্র জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

ফলে গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্যান্য খাতের মতোই বিএসইসিতেও আসে পরিবর্তনের হাওয়া। সংস্থাটির নতুন কমিশনের নেতৃত্বে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। তিনি দায়িত্ব নিয়েই অতীতের বড় বড় কারসাজির ঘটনা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন।

বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে শুরু করেন ব্যাপক জরিমানার কার্যক্রম। বেক্সিমকো, ওরিয়ন ফার্মা, ওরিয়ন ইনফিউশনসহ বেশকিছু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে গৃহীত হয় নজিরবিহীন জরিমানা, যার মোট অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৩৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এটি দেশের পুঁজিবাজার ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ জরিমানার রেকর্ড।

তবে এসব জরিমানা আদায়ের ক্ষেত্রে বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। কমিশন গত ১৭ মাসে এক টাকাও আদায় করতে পারেনি। আইন ও প্রক্রিয়ার মারপ্যাঁচেই এসব অর্থ সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে না বলে স্বীকার করছে বিএসইসি কর্তৃপক্ষ। ফলে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৭ মাসে বিভিন্ন অনিয়মের কারণে এক হাজার সাত শত কোটি টাকার বেশি জরিমানা করেছে। কিন্তু আদায় হয়নি এক টাকাও।

ফলে কোনো ধরনের অনিয়মের কাছে মাথা নত করবে না বলেও ঘোষণা দিয়ে বিএসইসি নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ইতিমধ্যে বিএসইসি নানা অনিয়মের কারণে বড় ধরনের জরিমানা করলেও এটা আদায়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সবার আগে আইনের সংস্কার প্রয়োজন।

জরিমানা আদায় হয়েছে কি না জানা নেই উল্লেখ করে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে জরিমানা করে তা আদায় হওয়ার রেকর্ড আছে বলে আমার জানা নেই। এর কারণ হচ্ছে সময়োপযোগী কার্যকর আইন না থাকা। নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে আইন প্রয়োগ করলে তা বাস্তবায়ন হতো।

কিন্তু আইনি মারপ্যাঁচের ফাঁকে কারসাজি চক্র বেঁচে যাওয়ায় একই কাজ বারবার করার সুযোগ পায়। যার কারণে জেনেশুনেই তারা কারসাজি করে। যে জরিমান করে আদায় করা যায় না, তা না করে বিকল্প শাস্তির ব্যবস্থা নিয়ে কমিশনকে ভাবা উচিত বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। কারণ সম্প্রতি আমরা দেখছি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে বড় অংকের আর্থিক জরিমানা করেছে।

গত ১৭ মাসে রাশেদ মাকসুদ কমিশনের জরিমানা করা অর্থের পরিমাণ এক হাজার সাতশত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিশাল অংকের অর্থ জরিমানা করলেও বাস্তবে আদায়ের পরিমাণ একেবারে শূন্য বলা চলে। এই অবস্থায় মনে করি, এ ধরনের অবাস্তব জরিমানা না করে বিকল্প কোনো শাস্তির ব্যবস্থা করা যায় কি না তা কমিশনকে ভাবতে হবে।

কারণ জরিমানা করে যদি জরিমানার অর্থ আদায় করা না যায়, এই জরিমানা করার কোনো মানে হয় না। যাদেরকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে তাদের একটা বড় অংশ পরবর্তীতে আদালতে গিয়ে জরিমানা স্থগিতের অর্ডার নিয়ে এসেছে। ফলে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার জন্য যে অর্থ জরিমানা করেছিল তা কোনো কাজে আসেনি।

বিএসইসির আইনে বলা আছে, অর্ডার ইস্যুর পর একটা নির্দিষ্ট সময় দেওয়া থাকে, এই সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ করতে হয়। এই সময়ে জরিমানা পরিশোধ না করলে প্রতিদিনের জন্য পুনরায় আরেকটি জরিমানার বিষয় রয়েছে এবং এটি পাওয়ার পরে পরবর্তী সময়ে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জের অর্ডিন্যান্স ৬৯- এর সেকশন ২২ এর ধারায় জরিমানা করা হয়।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম সম্প্রতি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়, তাদের কিছু রাইটস আছে। তারা ডিভিশন করতে পারেন অথবা রিভিউ করতে পারেন। ডিভিশনের জন্য আছে ৯০ দিন আর রিভিউয়ের জন্য আছে ১৮০ দিন। আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার জন্য এই সময়টা অপেক্ষা করতে হবে। ফলে আট থেকে নয় মাস লেগেই যাবে। তিনি বলেন, যে প্রক্রিয়াগুলো রয়েছে, এতে কেউ যদি আবেদন করে বা কেউ কোনো মামলা নাও করে, কিন্তু ওই সময়টা ধরে আমাদেরকে যেতে হবে।

এটা পাবলিক ডিমান্ড হিসেবে পিডিআর অ্যাক্টে সার্টিফিকেট কোর্টে আমরা মামলা করবো। আমরা জরিমানা করেছি। কেউ না দিলে এটা তো আর জোর করে নিয়ে আসতে পারবো না। মামলা করার পরে ওই কোর্ট তাকে সমন জারি ও ওয়ারেন্ট ইস্যু করে নিয়ে আসতে পারে। জরিমানা হলেই যে আদায় হয়ে যাবে, ঘটনাটা এমনও নয়। এছাড়া আরেকটি বিষয় রয়েছে, কেউ যদি আমাদের এই জরিমানাকে চ্যালেঞ্জ করে রিট করে। এই রিট নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জরিমানার টাকা পাওয়া যাবে না।

বিএসইসির এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান কমিশন দ্রুততম সময়ে বেশ কিছু এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম শেষ করে অর্ডার ইস্যু করেছে। অর্ডার ইস্যুর ক্ষেত্রে অর্ডারের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট সময় দেওয়া থাকে যে এতদিনের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ করতে হবে। তবে আদেশের ডেটের এই সময়ের মধ্যে জরিমানা না দিয়ে রিভিশন বা রিভিউ করতে পারেন অভিযুক্তরা। এক্ষেত্রে প্রত্যেকেই রিভিশন বা রিভিউ করেছে।

রিভিউ আন্ডার প্রসেসে আছে। বেশ কিছু রিভিউ রিজেক্ট হয়েছে। আগের জরিমানাই বহাল আছে। এই রিভিউ প্রক্রিয়া শেষ হলে রিভিউয়ের আগের জরিমানা যদি বহাল থাকে, রিভিউতে আবার হেয়ারিং করে তাদের বক্তব্য শোনার পরে যদি জরিমানা বহাল থাকে, সেক্ষেত্রে ওই আদেশটাকে মহামান্য আদালতে চ্যালেঞ্জ করে রিট করতে পারে।

তিনি বলেন, এই আইনের প্রসেসগুলো যখন শেষ হবে, তারপরও যদি জরিমানা আদায় না হয় তখন সার্টিফিকেট কেস হবে। সার্টিফিকেট কেস হলো জরিমানা আদায়ের জন্য, আদালতের আদেশক্রমে পরবর্তীতে জরিমানা আদায় করা হয়। হাইকোর্ট যদি এই রায় স্থগিত করে দেয় তাহলে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম স্থগিত থাকে আর যদি হাইকোর্ট নিষ্পত্তি করেও দেয় এরপরও মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের ফুল বেঞ্চেও আপিলের সুযোগ থাকে। এই আইনের সব লেয়ার সম্পূর্ণ হওয়ার পরই জরিমানা কত হলো বা কতটুকু আদায় হলো না তা বলা যাবে।

কেননা প্রত্যেকটি লেয়ারে আবার পরিবর্তন এবং বিভিন্ন নির্দেশনাও আসতে পারে। আগামীতে যে সংস্কার হবে টাস্ক ফোর্সের যে সুপারিশ করবে সেগুলো বাস্তবায়িত হলে এবং গভর্নেন্স যদি কমিশন এনসিওর করতে পারে তাহলে আগামীতে একটি ম্যাচিউরড বাজার দেখতে পারবো, সে বাজারের যে গ্রোথ হবে সেটা টেকসই হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, শুধু জরিমানা করে হিতে বিপরীত হচ্ছে। জরিমানা আদায় তো হচ্ছে না, উল্টো বাজারে একটি অস্বস্তি ও ভীতি তৈরি হচ্ছে। বর্তমান কমিশনের অধীনে গত ১৭ সাসে ৩৫০ এর বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা প্রায় পুরোটাই জরিমানা নির্ভর। এই সময়ে প্রায় ১,৭০০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কিছু মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সও বাতিল করা হয়েছে। তবে এই বিপুল পরিমাণ জরিমানার আদায়ের হার খুবই নগণ্য। আইনি মারপ্যাঁচে আদায়ের খাতা প্রায় শূন্য।

এদিকে শেয়ার কারসাজিতে জড়িতদের বক্তব্য এবং তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়, উপস্থাপিত অভিযোগসমূহ সঠিক ও ইচ্ছাকৃত এবং কর্মকাণ্ডের ফলে পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন যা পুঁজিবাজার উন্নয়নের পরিপন্থী, সেহেতু এক্ষেত্রে অভিযুক্তদের ব্যাখ্যা কমিশনের নিকট গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়নি।

যেহেতু অভিযুক্তদের কর্মকাণ্ড সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিনেন্স, ১৯৬৯ এর সেকশন ১৭(ই)(৫) এবং সেকশন ১৭(ই)(২) লংঘন করেছে, যা সিকিউরিটিজ আইনের পরিপন্থী। যেহেতু অভিযুক্তরা উপর্যুক্ত কর্মকাণ্ড সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিনেন্স, ১৯৬৯ এর সেকশন ২২ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ: যেহেতু, কমিশনের বিবেচনায়, সিকিউরিটিজ আইন ও বিধি-বিধান পরিপালনে ব্যর্থতার জন্য, পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থে আলোচ্য ব্যক্তিদের জরিমানা করা হয়।