স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: জুলাই আন্দোলনের পর সরকার পতনের সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তড়িঘড়ি করে আর্থিক খাত সংস্কারের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এই পদক্ষেপের মধ্যে কমপক্ষে তিনটি পদক্ষেপ ব্যাংক ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের উদ্বিগ্ন করেছে। মুলত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গেও বিমাতাসুলভ আচরণ করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কোনো ধরনের কর্মকর্তা ছাঁটাই বা হয়রানি করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি রাখল না নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (ডিএমডি) একসঙ্গে ৩০ কর্মীকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে এক্সিম ব্যাংকের।  এ নিয়ে বিস্তর ক্ষোভ জমা হয়েছে ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, দক্ষ কর্মীদের টার্গেট করে ওএসডি করা হচ্ছে। এতে পুরো ব্যাংকের কর্মকর্তারা মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যার প্রভাব পড়ছে তাদের দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এক্সিম ব্যাংকের মতো একটা ভালো ব্যাংক রাজনৈতিক ভাবে ধ্বংস হয়ে গেল। এরকম সিদ্ধান্ত দেশের পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দিকে ঠেলেছে। মুলত খায়রুল ও শিবলী কমিশন বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে একচেটিয়া সুবিধা দেয়ায় পুঁজিবাজার ধ্বংসের প্রান্তে চলে গেছে। গত ৫ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদের কমিশন শেয়ারহোল্ডার ও বিনিয়োগকারীদের নানা স্বপ্ন দেখালেও, সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকটির এক কর্মকর্তা বলেন, ওএসডি করা এক কর্মীর মা তার সন্তানকে ওএসডি করার খবর শুনে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এ কারণে ওই কর্মী ঠিকমতো কাজও করতে পারছেন না। তারা আরও বলছেন, সম্মিলিত পাঁচ ব্যাংকে যেসব হয়রানি করা হচ্ছে, তার মূল টার্গেটে পরিণত হয়েছে এক্সিম ব্যাংক। ইতোমধ্যে তাদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওএসডি করার ঘটনায় ব্যাংক খাতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

ওএসডি হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ডিএমডি ছাড়া আরও রয়েছেন এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (ইভিপি), জেনারেল ম্যানেজার (জিএম), সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি), ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম), ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি), অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম), অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি), ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রিন্সিপাল অফিসার (পিও) এবং সিনিয়র অফিসার (এসও) পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের দেওয়া আশ্বাসের বাস্তবায়ন নিয়েও। একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার শুরুতে গভর্নর একাধিক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, একীভূত ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি যাবে না। কিন্তু শীর্ষ ৩০ কর্মকর্তাকে ওএসডি করায় সেই আশ্বাস কার্যত প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

এক্সিম ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, ওএসডি হওয়া কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। হঠাৎ করে তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ায় ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম ও মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে দক্ষ কর্মকর্তাদের ওএসডি করায় ব্যাংকটির মানবসম্পদ সংকটও সামনে আসছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের স্থায়ীকরণের দাবিও। এক্সিম ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় প্রায় ২৪ বছর ধরে গোডাউন ইন্সপেক্টর ও গোডাউন গার্ডের চাকরি করছেন এমন ৭০ কর্মকর্তার শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এখনো অস্থায়ী হিসেবে চাকরিতে আছেন।

এক্সিম ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সাবেক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ীকরণের আশ্বাস দিলেও তাদের চাকরিতে স্থায়ী করেননি। এ নিয়ে কথা বলায় নবাবপুর শাখা থেকে পাঁচ কর্মীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন এসব ব্যাংক কর্মকর্তা স্থায়ী কর্মকর্তাদের মতোই কাজ করলেও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত হয়ে আসছেন। এ নিয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওএসডি করার ঘটনায় ব্যাংকের অস্থায়ী কর্মকর্তাদের মধ্যে চাকরি হারানোর শঙ্কা প্রকট হয়েছে।

চাকরিতে স্থায়ীকরণের দাবি জানিয়ে গত ২৮ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বরাবর আবেদন করেছেন। সেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের চাকরিতে স্থায়ীকরণের আবেদন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন শাখা ব্যবস্থাপকরাও তাদের চাকরিতে স্থায়ীকরণের যে দাবি জানিয়েছেন, সেই তথ্য যুক্ত করেছেন গোডাউন ইন্সপেক্টর ও গোডাউন গার্ডরা।

বঞ্চিত ওই কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগও জানিয়েছেন। চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের পরও স্থায়ী না হওয়া তাদের জন্য চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একীভূতকরণের পর এই সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো অগ্রগতি হয়নি।

ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, একীভূত ব্যাংকে এমন আকস্মিক ওএসডি সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘদিনের জনবল সমস্যার সমাধান না হলে তা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নেতিবাচক বার্তা দেবে। তারা বলছেন, একীভূতকরণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল স্থিতিশীলতা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের একযোগে ওএসডি করা সেই লক্ষ্যকে দুর্বল করতে পারে।

২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. শওকাতুল আলম পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণের অংশ হিসেবে এক্সিম ব্যাংকের প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। গত ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর আর্থিক সংকট ও উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংক গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সম্মিলিত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের সুবিধা হলো ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। শেয়ার রূপান্তরের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের ১৫ হাজার কোটি টাকা মূলধনে রূপান্তর করা হবে। ব্যাংকটির অর্ধেক পরিচালক স্বতন্ত্র হবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান বলেন, ওএসডি মানেই চাকরিচ্যুত নয়। ব্যাংকগুলোতে ফরেনসিক অডিট করা হচ্ছে, যাদের কারণে ব্যাংকগুলোর আজকের এই দুরবস্থা, তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের অবশ্যই চাকরিচ্যুত করা হবে। তবে কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানি বা চাকরিচ্যুত করা হবে না।