এনআরবিসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণে লভ্যাংশ বঞ্চিত শেয়ারহোল্ডারা
আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানি এনআরবিসি ব্যাংক টানা দ্বিতীয় বছর লভ্যাংশ বঞ্চিত করেছে শেয়ারহোল্ডাদের। মুলত ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ২০২৫ সালের ব্যবসায়ও শেয়ারহোল্ডারদেরকে বঞ্চিত করতে কোন লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। এর মাধ্যমে পুরোটা বা ৭০ শতাংশের বেশি মুনাফা রিটেইন আর্নিংসে রাখা হবে।
যে কারনে কোম্পানিটিকে রেখে দেওয়া ওই মুনাফার উপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের অনুমোদিত বাজেট অনুযায়ি, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে মুনাফার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ আকারে শেয়ারহোল্ডারদেরকে দিতে হবে। যদি ৩০ শতাংশের কম দেওয়া হয়, তাহলে রিটেইন আর্নিংসে স্থানান্তর করা পুরো অংশ বা কোম্পানিতে রেখে দেওয়া পুরোটার উপরে ১০ শতাংশ হারে কর আরোপ করার বিধান রাখা হয়।
এনআরবিসি ব্যাংকের ২০২৫ সালে শেয়ারপ্রতি ০.১৬ টাকা হিসাবে ১৩ কোটি ২৬ লাখ টাকার নিট মুনাফা হয়েছে। এর বিপরীতে কোম্পানিটির পর্ষদ কোন লভ্যাংশ না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে মুনাফার পুরোটাই রিটেইন আর্নিংসে রাখা হবে।
মুনাফার ৭০ শতাংশের বেশি রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে রিটেইন আর্নিংসে রাখতে চাওয়া ১৩ কোটি ২৬ লাখ টাকার উপরে ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার অতিরিক্ত কর দিতে হবে এনআরবিসি ব্যাংককে। এর আগে ২০২৪ সালে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি ০.০৯ টাকা হিসাবে ৭ কোটি ১৪ লাখ টাকার নিট মুনাফা হয়েছিল। এর বিপরীতেও ব্যাংকটির পর্ষদ কোন লভ্যাংশ দেয়নি। যাতে ব্যাংকটি ৭১ লাখ টাকা জরিমানার কবলে পড়ে।
তবে বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে আলোচিত-সমালোচিত এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির ব্যবসায়িক পারফর্মেন্স মোটেই ভালো অবস্থায় নেই। ব্যাংকের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান পরিচালনা পর্ষদকে নিয়োগ দিয়েও কোনো সুফল পাচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। ইতিমধ্যে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্য, পেশাদারিত্বের অবমূল্যায়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অভিযোগ উঠেছে, যেমনটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ব্যাংকটির সাবেক পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে ছিল।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির ঋণ খেলাপি বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। শুধু কি তাই? ব্যাংকটির মূল চালিকা শক্তি আমানতের পরিমাণ কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। এমন বাস্তবতায় ব্যাংকটির কার্যক্রম নিয়ে রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের ধারণ, ব্যাংকটির কার্যক্রম এভাবে চলতে থাকলে খুব শিগগিরই দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত বছর (৩১ ডিসেম্বর ২০২৪) এনআরবিসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ হয়েছে দুই হাজার ২৮৩ কোটি ৬৭ লাখ ৩৪ হাজার ৭৩ টাকা। এর আগের বছর (৩১ ডিসেম্বর ২০২৩) যা ছিল ৭৭৫ কোটি ৫৭ লাখ ৪৮ হাজার ৬৮৭ টাকা। বছরের ব্যবধানে ঋণ খেলাপি বেড়েছে এক হাজার ৫০৮ কোটি ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৩৮৬ টাকা বা ১৯৪ শতাংশ। এদিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকটির প্রতি আমানতকারীদের আস্থা, বিশ্বাস ও আগ্রহ কমতে শুরু করেছে। বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের আমানত কমেছে ৩৭ শতাংশ।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের আমানতের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৮৭৪ কোটি ৮০ লাখ ৯৮ হাজার ৪২৭ টাকা। আর এর আগের বছর যা ছিল এক হাজার ৩৮০ কোটি ৪৬ লাখ ৪ হাজার ৭৭ টাকা। বছরের ব্যবধানে গ্রাহকদের আমানত কমেছে ৫০৫ কোটি ৬৫ লাখ ৫ হাজার ৬৫০ টাকা বা ৩৭ শতাংশ।
এমন পরিস্থিতিতে খাত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক এনআরবিসির সাবেক চেয়ারম্যান এসএম পারভেজ তমালের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে। তিনি সেসময় ব্যাপক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। শেয়ার কারসাজির মাধ্যমে বিভিন্ন শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন তিনি। এমন বাস্তবতায় গত ১২ মার্চ, ২০২৫ তারিখে বর্তমান অন্তরবর্তী সরকার ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ বোর্ড ভেঙ্গে নতুন বোর্ড গঠন করে দেয়।
কিন্তু নতুন বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়ার বিরুদ্ধেও নিয়োগ বাণিজ্যসহ দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ ব্যাংকটির রক্ষকেই যেন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। মধ্যখানে আমানত ও বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকটি থেকে কাঙ্খিত সুফল না পেয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন। ব্যাংকটির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলায় আমানতকারী আমানত রাখা কমিয়ে দিয়েছে। আর শেয়ারটি থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।



