স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি আর্থিকখাত। বিশেষ করে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার। জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ব্যাংকিং খাতে নানামুখী সংস্কার ও পদক্ষেপের মাধ্যমে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলেও আর্থিকখাতের আরেক চালিকাশক্তি পুঁজিবাজারে বিপরীত অবস্থা বিরাজমান। ক্রমান্বয়ে পুঁজিবাজার ডুবতে বসেছে। স্পর্শকাতর এই খাতটির সঙ্গে লাখ লাখ বিনিয়োগকারীদের সরাসরি বিনিয়োগ জড়িত, প্রতিদিনের লেনদেনের প্রতিফলন ঘটে সূচক উঠা-নামার মাধ্যমে, ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়াটিও সূচকের সমান্তরাল রেখায় প্রতিফলিত হয়।

অবশ্য এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ শীর্ষ ব্যক্তিদের খামখেয়ালীপনা, বাজার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব, নানা হঠকারী সিদ্বান্ত, ব্যক্তিগত অভিপ্রয়াস, পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে অবমূল্যায়ন, কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নতুন মিউচুয়্যাল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫ ও মার্জিন রুলের মতো আত্মঘাতি সিদ্বান্ত বাস্তবায়ন, আইপিও খরা, পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদেরকে অবমূল্যায়ন এবং একটি স্বার্থান্বেষী কুচক্রি মহল দ্বারা প্রভাবিত হওয়াসহ নানাবিধ কারণে দেশের পুঁজিবাজার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

এছাড়া দেশের শিল্পায়নের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় না পৌঁছানোর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঘাটতি অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও সম্প্রসারণে বিপুল মূলধনের প্রয়োজন হলেও দেশের অর্থায়ন কাঠামো এখনো মূলত ব্যাংকনির্ভর। উচ্চ সুদের চাপ, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা এবং আর্থিক ঝুঁকি অনেক উদ্যোক্তার জন্য বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

ফলে শিল্পখাতের সম্প্রসারণ কাঙ্খিত গতিতে এগোতে পারে না। রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের পুঁজিবাজারে নজিরবিহীন স্থবিরতা বিরাজ করছে। গত ১৯ মাসে কোনো নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। এমনকি এ সময়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদনের জন্যও কোনো আবেদন জমা পড়েনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে।

এদিকে রাশেদ মাকসুদ কমিশন যেন মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা! স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পর সবার প্রত্যাশা ছিল পুঁজিবাজার দৈন্যদশা থেকে মুক্তি পাবে। একই সঙ্গে মাকসুদ কমিশন নতুন মিউচুয়্যাল ফান্ড বিধিমালা ও মার্জিন রুলের মতো এমন কিছু কালো আইন বাস্তবায়ন করেছে যার ফলে বিনিয়োগকারীরাও আরো সর্বস্বান্ত হবে। এদিকে একাধিক কালো আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিপর্যস্ত পুঁজিবাজারকে আরো বিপর্যস্ত করার মাধ্যমে নতুন সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টায় লিপ্ত মাকসুদ কমিশন। একই সঙ্গে এসব কালো আইনের মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজার যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে তেমনি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেশের বিনিয়োগও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএনপি সরকার ও পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীদের যেন আস্থার নাম। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা ছিল শেখ হাসিনার সহচর রাশেদ মাকসুদসহ তার কমিশনকে বাদ দিয়ে নতুন করে সাজানো হবে কমিশন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে পুঁজিবাজারের সার্বিক উন্নয়ন, সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি পুঁজিবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে একটি শক্তিশালী ও আধুনিক পুঁজিবাজার তৈরির অঙ্গীকার করেছেন।

এছাড়া, বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। যদিও বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় দু’মাস অতিবাহিত হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দায়িত্ব পাওয়া বিতর্কিত রাশেদ মাকসুদ এখনও স্বপদে বহাল রয়েছেন। আর্থিকখাতে নানা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও শেয়ারবাজারের শত্রু হিসেবে পরিচিত এই কমিশনই বহাল রয়েছে।

এতে বাড়ছে পুঁজিবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের হতাশা। যদিও সরকারের একাধিক ঊর্ধ্বতন সূত্র জানিয়েছে, পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি থেকে শুরু করে আর্থিকখাতকে দ্রুতই ঢেলে সাজানো হবে। ইতোমধ্যে উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র মতে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ব্যাংকিং খাতসহ দেশের অন্যান্য আর্থিক খাতে নানামুখী সংস্কার ও পদক্ষেপের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলেও আর্থিকখাতের গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি পুঁজিবাজারে বিপরীত অবস্থা বিরাজমান। দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়নের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ড। মেয়াদি ফান্ড দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহিত করে, পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের সুযোগ প্রদান করে। ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত, পুঁজিবাজারে ৩৬টি ক্লোজ-এন্ড ফান্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে, যার মোট সম্পদ প্রায় চার হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।

অথচ মাকসুদ কমিশন দ্বারা জারিকৃত নতুন মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫ এর ৬২ (২) অনুযায়ী এই বিধিমালা সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হওয়ার পরবর্তী ছয় মাস, কোনো বিদ্যমান মেয়াদি স্কীমের ইউনিট প্রতি গড় ট্রেডিং মূল্য, যদি উক্ত স্কীমের ক্রয়মূল্য ও ফেয়ার ভ্যালুতে প্রকাশিত ইউনিট প্রতি নীট সম্পদের গড় মূল্যের মধ্যে যা বেশি হবে, তার চাইতে ২৫ শতাংশ কম হয় তাহলে উক্ত মেয়াদি স্কীম অবলুপ্তির সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কমিশন।

বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে একটি কালো আইন হিসেবে দেখছেন। কারণ এমন অবলুপ্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার হাজার হাজার কোটি টাকার মূলধন হারাবার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা সামগ্রিক পুঁজিবাজারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতির কারণ হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, ট্রেডিং মূল্য কিংবা বাজার মূল্য কখনো সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকেনা। এটা নির্ধারণ করে দেওয়ার নজির পৃথিবীর কোথাও নেই। যদিও ইতিপূর্বে দু’একটি মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ড অন্যায়ের আশ্রয় গ্রহণ করেছে। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করারও ক্ষমতা আছে কমিশনের। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা না নিয়ে মাকসুদ কমিশন পুরো মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের উপর চাপিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে পুঁজিবাজারকে অস্থিতিশীল করার পায়তারা বলছেন। তাদের মতে, মাথা ব্যথার কারণে মাথার চিকিৎসা না করে, মাথা কেটে ফেলার মত অবস্থা। উন্নত বিশ্বে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য ইটিএফ, কমোডিটি ফান্ড, ইকুইটি ফান্ড, ডেট ফান্ডসহ বিভিন্ন বৈচিত্রময় মেয়াদি ও বে-মেয়াদি ফান্ডে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে অপরদিকে আমাদের দেশে মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সুযোগ খুবই সীমিত, কারণ দেশে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বৈচিত্রতা নেই বললেই চলে।

তাই পুঁজিবাজারের বৃহত্তর স্বার্থে মেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডসহ আরো বৈচিত্রময় মেয়াদি ফান্ড যেমন: স্থায়ী আয় ফান্ড, ব্যালেন্সড ফান্ড এবং সেক্টর-নির্দিষ্ট ফান্ড প্রবর্তন করলে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। যা কেবল বাজারের গভীরতা ও বিনিয়োগকারীর জন্য বিকল্প বিনিয়োগের মাধ্যম বৃদ্ধি করবে না, বরং দেশের পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

এদিকে মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫-এ এক দিকে ট্রাস্টি ও কাস্টোডিয়ান প্রত্যেকের ফি পূর্বের তুলনায় প্রায় ৫ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এমনকি নিয়ন্ত্রক সংস্থার ফিও বৃদ্ধি করা হয়েছে। অপরদিকে সম্পদ ব্যবস্থাপকের ব্যবস্থাপনা ফি পূর্বের বিধিমালা থেকে কমানো হয়েছে। গত পঁচিশ বছরে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতাসহ পরিচালনা ব্যয় অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই বর্ধিত ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফি কমানো হলে, দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপকদের পক্ষে পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মিউচ্যুয়াল ফান্ড শিল্প এখনো প্রাথমিক বা বিকাশমান পর্যায়ে রয়েছে এবং বেশিরভাগ ফান্ডের আকার তুলনামূলকভাবে ছোট, তাই বিদ্যমান গণনার অধীনে ফি কমানো হলে ছোট আকারের তহবিল পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর পক্ষে টিকে থাকা দুরূহ হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০২৫-এ ব্যবস্থাপনা ফি সীমিত করার ফলে সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানিগুলোর বর্তমানের তুলনায় ২৩ শতাংশ ব্যবস্থাপনা ফি কমে যাবে, যার ফলে সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানিগুলো টিকে থাকা কষ্টসাধ্য হবে। পাশাপাশি নতুন কোম্পানির অংশগ্রহণ কমে যাওয়া এবং এই শিল্পে দক্ষ ও পেশাদার জনবল আকৃষ্ট করা কঠিন হবে এবং ফান্ড ব্যবস্থাপনার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

এছাড়া মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০২৫-এ পরিচালনা পরিষদের মোট সদস্যের এক-পঞ্চমাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ প্রদানের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগের যৌক্তিকতা নেই, এক্ষেত্রে অর্থের অপচয়সহ অযাচিত জটিলতা তৈরির হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দ্বারা নিয়ন্ত্রণ কিংবা হস্তক্ষেপ করার প্রবানতাও দেখা দিবে।

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালে ১৮ আগষ্ট খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন ব্যাংকার এবং পুঁজিবাজার সম্পর্কে তার কোন ধারণাই ছিলনা। একইসঙ্গে কাজ করেছেন শেখ হাসিনার মদদপুষ্ট একাধিক ব্যাংকে। হাসিনার অন্যতম দোসর স্টান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদের সাথে ছিল তার দহরম-মহরম সম্পর্ক। কাজী আকরাম উদ্দিনকে লুটপাটের সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি তার সময়ে ব্যাংক দু’টিকে তলানীতে রেখে যান।

পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে বসে নানা হঠকারী সিদ্বান্ত ও ব্যক্তিগত অভিপ্রয়াসের মাধ্যমে তার আর্শিবাদপুষ্ট কিছু ব্যক্তিবর্গের যোগসাজশে এই খাতকে ধ্বংসের দারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এনআরবিসি ব্যাংকে চাকুরিকালীন ২০২৩ সালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থপাচারে জড়িত থাকার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এরপরও ক্ষমতার ব্যবহার করে শীর্ষপদ দখল করে রেখেছেন।