স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা ও সুশাসন জোরদার করা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি তিন ধাপের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে পরিকল্পনাটি প্রণয়ন করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন ও বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন এবং পৃথক ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ রাখা হয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে বাজারে স্বচ্ছতা আনতে কমিশনে সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের সামগ্রিক সংস্কারের জন্য একটি পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন এবং গত ১৫ বছরে সংঘটিত অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে। একই সময়ে জেলা পর্যায়ে বিনিয়োগ সেন্টার স্থাপন, প্রবাসীদের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ সুবিধা চালু এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় আগামী অর্থবছরের মধ্যে বিএসইসিকে একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বাজার তদারকিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ক্রয় ও ব্যয় নির্ধারণে পরামর্শক নিয়োগ করা হবে। বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। একই সময় সংস্কার কমিশন ও তদন্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিনিয়োগবান্ধব ও যুক্তিসংগত করনীতি প্রণয়ন এবং পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। করপোরেট গভর্নেন্স বিধিমালা, নিরীক্ষক প্যানেলভুক্তির নীতিমালা এবং বিনিয়োগকারীদের অদাবীকৃত মুনাফা বা শেয়ার ফেরত দিতে একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই তহবিল পরিচালনায় ‘ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থা ও পুঁজিবাজার শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় পুঁজিবাজারে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শক্তিশালী শেয়ার, বন্ড ও ইক্যুইটি মার্কেট গড়ে তোলা, করপোরেট বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং পর্যায়ক্রমে এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ), সুকুক ও গ্রিন বন্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। জলবায়ু সহনশীল প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকার ‘গ্রিন বাংলাদেশ বন্ড’ ইস্যুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে উৎসাহিত করতে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সীমা ও মেয়াদ নির্ধারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর বাজার গড়ে তুলতে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে ‘ফরেন পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট’ অনবোর্ডিং পোর্টাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্টার্টআপ ও এসএমই খাতের জন্য ৩০ দিনের মধ্যে তালিকাভুক্তির সুবিধাসহ ‘ডিজিটাল আইপিও এক্সপ্রেস’ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি চালুর মাধ্যমে অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় পৃথক পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা দায়েরের বিধান সিকিউরিটিজ আইনে যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা ও দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও চালু করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজারে সুশাসন ও আস্থা পুনর্গঠনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে বাজারের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে। এ বিষয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকারের প্রস্তাবগুলো আশাব্যঞ্জক ও সময়োপযোগী। বাজার উন্নয়নে এসব কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য আমরা সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছি।