মেহেদী হাসান, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি ন্যাশনাল টি (এনটিসি) বর্তমানে গভীর আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। টানা লোকসান, ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা, ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজার সংকোচনের কারণে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

হবিগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলের জগদীশপুর, তেলিয়াপাড়া, চন্ডিছড়া, পারকুল, মাধবপুর, প্রেমনগর, বিজয়া, পাত্রখোলা, চাম্পারাই, মদনমোহনপুর ও লাক্কাতুরাসহ ১২টি চা বাগান নিয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটি একসময় দেশের চা শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বর্তমানে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ফলে ন্যাশনাল টি কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনা ও টিকে থাকা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান আর্টিজান চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস। কোম্পানিটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চরম আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত সংকটের এই চিত্র।

নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে কোম্পানির নিট লোকসান ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩৯ কোটি ৯ লাখ টাকায়। চার বছর ধরে ইতিবাচক নগদ প্রবাহ তৈরিতে ব্যর্থ হওয়ায় ভবিষ্যতে ব্যাংক ঋণ ও অন্যান্য দায় পরিশোধের সক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কোম্পানির ঋণনির্ভরতাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি মিলিয়ে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

এ ছাড়া কোম্পানির ইক্যুইটি বা নিট সম্পদ নেতিবাচক হয়ে ৯৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকায় নেমেছে। ফলে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১৪৪ দশমিক ৯৭ টাকা, যা গভীর আর্থিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, আর্থিক হিসাবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হিসেবে মোট ১৭৫ দশমিক ১৩ টাকা দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ঋণ ও সুদ ১৩৪ দশমিক ৪৪ টাকা অন্তর্ভুক্ত। তবে ঋণের চলতি অংশ আলাদাভাবে না দেখানোয় এর অনুমোদন ও যথাযথ শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক।

আর্থিক সংকটের পাশাপাশি কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন কাঠামো এবং আইনগত পরিপালনেও গুরুতর দুর্বলতা পেয়েছেন নিরীক্ষক। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অমান্য করে ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) এবং আয়কর রিটার্ন সময়মতো দাখিল করা হয়নি। আগের অর্থবছরের বার্ষিক সাধারণ সভাও (এজিএম) যথাসময়ে হয়নি, যা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন।

নিরীক্ষক আরও জানিয়েছেন, কোম্পানিতে যথাযথ নথি ও অনুমোদন ছাড়াই অননুমোদিত অর্থ পরিশোধের প্রমাণ মিলেছে। ব্যবস্থাপনায় ঘন ঘন পরিবর্তন, হিসাব-অর্থ বিভাগে দক্ষ জনবলের অভাব এবং কার্যকর বাজেটিং, সুস্পষ্ট ব্যবসায়িক লক্ষ্য ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন পদ্ধতির অভাবে সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহি মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

কোম্পানির পরিচালক শাকিল রিজভী এই মন্দার জন্য প্রধানত কৃষি ব্যাংকের উচ্চ সুদের ঋণকে দায়ী করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, উচ্চ সুদের কারণে প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। দুই বছর ধরে সমাধানের চেষ্টা করেও ব্যাংকটির কাছ থেকে কার্যকর সাড়া মেলেনি। এ ছাড়া করোনা মহামারীর সময়ের ব্যবসায়িক ক্ষতির প্রভাবও কোম্পানিটি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

১৯৭৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ন্যাশনাল টির পরিশোধিত মূলধন ২৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ২ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার। এর মধ্যে ৩৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩১ দশমিক ৪৯ শতাংশ ও সরকারের হাতে ৫ দশমিক ২২ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ২৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।