আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজার পতনের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। গত ১৬ বছরে পুঁজিবাজার ছেড়েছে প্রায় ১৭ লাখ বিনিয়োগকারী। আর এক দশকের বেশি সময়ে পুঁজিবাজার সংকুচিত হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বছর পনেরো আগে পুঁজিবাজারে বড় ধসের পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ড. এম খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুন কমিশন গঠন করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।

দীর্ঘ ৯ বছর দ্বায়িত্বে থেকেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয় সেই কমিশন। শুধু খায়রুল কমিশন নয়, এরপর বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পাওয়া অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম ও রাশেদ মাকসুদের কমিশনের অধীনে পুঁজিবাজার সংস্কারের অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বিনিয়োগকারীদের মাঝে কাঙ্খিত আস্থা ফেরাতে পারেনি।

এই পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, সরকারকে ব্যাংক নির্ভরতা কমাতে হলে পুঁজিবাজারে গতি আনতে হবে। আর এ লক্ষ্যে বাজেটে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানোই এখন সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

তবে রাতারাতি পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরবে না বিনিয়োগকারীদের। বাজেটে পদক্ষেপ নিলেই হবে না, এর যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। পুঁজিবাজারে কারসাজিতে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে এআই প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এর চেয়ারম্যান ড. আবু আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারে গতি আনতে এর আগেও নীতি-সহায়তা দেওয়া হয়েছে, বহু মিটিং হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এসবের ফলে পুঁজিবাজারে কতটা গতি এসেছে? গত দুই বছরে একটিও নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। প্রস্তাবিত বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপের ফলে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না, তা আগস্টে বোঝা যাবে।

সরকারকে শুধু নীতি-সহায়তা দিয়ে বসে থাকলেই হবে না। পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষকে স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে হবে। কেন এসব বড় কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসছে না, তা চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। বাজারে বিনিয়োগকারী বাড়াতে হবে। বন্ড ইস্যুও করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারে অ্যাসেট সিকিউরিটাইজেশন বাড়াতে হবে। অ্যাসেট সিকিউরিটাইজেশন হলো একটি অর্থায়ন প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অ-তরল সম্পদ–যেমন ঋণ, বন্ধকী, লিজ বা প্রাপ্য অর্থ–একত্রিত করে সহজে বিনিময়যোগ্য সিকিউরিটিতে রূপান্তরিত করে। এটি মূলত কোনো প্রতিষ্ঠানকে তাদের ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আয়কে তাৎক্ষণিকভাবে নগদ অর্থে পরিণত করতে সাহায্য করে। বাজারে নেওয়া পদক্ষেপের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ প্রভাবে অ্যাসেট সিকিউরিটাইজেশন কতটা বাড়বে তা দেখতে হবে।

অর্থনীতির আরেক বিশ্লেষক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণে এরই মধ্যে নতুন কমিটি করা হয়েছে। পুঁজিবাজারকে নিজস্ব নিয়মে চলতে দিতে হবে। সরকারকে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ওবং ঋণনির্ভরতা কমাতে হলে পুঁজিবাজারের ওপর নির্ভর করতে হবে।

এ জন্য পুঁজিবাজারে গতি আনতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে অনেক কথা বলা হয়েছে। এ সবের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। শুধু কথার কথা যেন না হয়। দেশের শেয়ার তথ্যভান্ডার সেন্ট্রাল ডিপজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্যানুসারে, ২০১০ সালে বিও হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ৩৪ লাখ। বর্তমানে এই সংখ্যা ১৬ লাখ ৩৯ জন।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে আস্থার সংকটের কথা দীর্ঘ সময় ধরেই আলোচিত। শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। অনেকে এই কারসাজির সঙ্গে জড়িত থাকলেও তার বিচার হয়নি।

পুঁজিবাজারে গতি আনতে হলে কারসাজিতে জড়িতদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির সুবিধার মধ্যে পার্থক্য বাড়াতে হবে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুবিধা বাড়াতে হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ইস্যুকারী কোম্পানি, ইস্যু ম্যানেজার, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা, শেয়ার ‘টি+শূন্য’ (দিনে কিনে দিনেই বিক্রি) ব্যবস্থায় নিয়ে আসা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ও শেয়ার বিক্রির অর্থ এক কর্মদিবসের মধ্যে প্রত্যাবাসনের সুবিধার কথা বলা হয়েছে। বাজেটে বলা হয়েছে, কোম্পানির বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো  উন্নয়নে পৌর বন্ড ইস্যুর ব্যবস্থা করা হবে। সরকারি ও বেসরকারি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অর্থায়নে বন্ড, সুকুক, অবকাঠামো তহবিলসহ বিভিন্ন অর্থায়ন উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।

পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্স এর সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আল-আমিন বলেন, পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরানোর জন্য প্রয়োজন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি ও স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ। বাজেটের কিছু করছাড় বা প্রণোদনা দিয়ে পুঁজিবাজারের গভীর সংকট কাটিয়ে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। বাজারে আস্থা ফেরাতে হলে নীতিমালার স্থিতিশীলতা সবচেয়ে জরুরি।

বাজেট প্রণয়নের সময় বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার চেয়ে সাময়িক সুবিধার দিকে বেশি নজর দেওয়া হয়, যা বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ভরসা অর্জনে ব্যর্থ হয়। বাজেটে যদি বিনিয়োগের ওপর করের বোঝা কমানো না যায়, তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্রের মতো নিরাপদ খাত ছেড়ে পুঁজিবাজারে আসার উৎসাহ পাবেন না।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের পুঁজিবাজার উন্নয়নে যে নীতিমালা ঘোষণা করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে। এসব নীতিমালা বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে।