পুঁজিবাজারে বন্ধ কোম্পানির বাধ্যতামূলক ডিলিস্টিং চায় ডিএসই
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে বছরের পর বছর ধরে চলছে কার্যক্রম বন্ধ ও লোকসানি কোম্পানির শেয়ারের লেনদেন। আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে ব্যর্থ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধান লঙ্ঘন এবং টানা লভ্যাংশ না দিলেও তালিকাভুক্ত অবস্থায় থেকে যাচ্ছে কোম্পনিগুলো। এতে একদিকে যেমন কিছুদিন পর পরই বাজারে জল্পনামূলক কারসাজির সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে বাজারকে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ ও গতিশীল করতে বাধ্যতামূলক তালিকাচ্যুতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান লিস্টিং রেগুলেশন সংশোধনের প্রস্তাব করেছে ডিএসই। ইতোমধ্যে সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদ প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে পাঠিয়েছে।
বর্তমান বিধিমালার (লিস্টিং রেগুলেশন) তালিকাচ্যুতি সংক্রান্ত প্রবিধান অনুযায়ী, টানা পাঁচ বছর কোনো লভ্যাংশ (নগদ বা স্টক) ঘোষণা করতে ব্যর্থ হলে, টানা তিন বছর বার্ষিক সাধারণ সভা না করলে এবং স্বেচ্ছায় বা আদালতের আদেশে অবসায়নে গেলে অথবা টানা তিন বছর বাণিজ্যিক উৎপাদন বা কার্যক্রম বন্ধ থাকলে স্টক এক্সচেঞ্জ তালিকাচ্যুতির সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এছাড়াও স্টক এক্সচেঞ্জের বার্ষিক তালিকাভুক্তি ফি বা অন্য কোনো পাওনা পরিশোধ না করলে এবং এই প্রবিধানমালা বা অন্য কোনো সিকিউরিটিজ আইন পালনে ব্যর্থতার কারণেও তালিকাচ্যুতির সিদ্ধান্ত নিতে পারে স্টক এক্সচেঞ্জ।
তবে ডিএসই মনে করছে, বর্ণিত ক্ষেত্রে তালিকাচ্যুতি বাধ্যতামূলক নয়। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনেকটাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। এ কারণে বহু অকার্যকর কোম্পানি বছরের পর বছর মূল বোর্ডে আছে এবং অনেক ক্ষেত্রে শেয়ারদরের জল্পনানির্ভর অস্বাভাবিক উত্থান-পতনের মাধ্যমে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এই অবস্থার পরিবর্তনে ডিএসই সময়সীমা নির্ধারণ করে বাধ্যতামূলক তালিকাচ্যুতির বিধান কার্যকর করতে চায়।
তবে কোনো কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাচ্যুত করা হবে না। এ ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় অনুসরণ করা হবে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে, এরপর শুনানির সুযোগ দেওয়া হবে এবং এর পরে তালিকাচ্যুতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে তালিকাচ্যুতির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোম্পানির আপিল করার সুযোগও থাকবে।
সংশোধনীতে প্রস্তাব করা হয়েছে, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা না দেওয়া, ঋণাত্মক নিট সম্পদ, ন্যূনতম ফ্রি-ফ্লোট শেয়ার বা মূলধনের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়া, প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা লঙ্ঘনের মতো কারণেও কোনো কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করা যাবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কোম্পানিকে তালিকাচ্যুতির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে কার্যক্রম কতদিন বন্ধ থাকলে তালিকাচ্যুতি হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ডিএসই বলছে, উৎপাদন বন্ধ হওয়ার কারণও এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হবে। যেমন- গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকলে এক ধরনের পদক্ষেপ হবে, আর স্পন্সর পরিচালক বা পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম-প্রতারণার কারণে প্রতিষ্ঠান অচল হলে তা ভিন্নভাবে দেখা হবে। তবে তালিকাচ্যুতি এড়ানোর সুযোগও রাখা হচ্ছে।
কোনো কোম্পানি যদি দুই বছরের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য কর্ম-পরিকল্পনা (রিহ্যাবিলিটেশন প্ল্যান) উপস্থাপন করতে পারে এবং স্টক এক্সচেঞ্জের তত্ত্বাবধানে তা বাস্তবায়ন করে, তাহলে বাধ্যতামূলক তালিকাচ্যুতি থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ থাকবে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায়ও নতুন বিধান যুক্ত করতে চায় ডিএসই। প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি তালিকাচ্যুত হলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের শেয়ার স্পন্সর পরিচালকদের কিনে নেওয়ার (বাইব্যাক) বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ৩৬০টি। এর মধ্যে নিয়মিত লভ্যাংশ বিতরণ ও বার্ষিক সাধারণ সভার আয়োজ করার ব্যর্থতায় ১২৫টি কোম্পানি ‘জেড’ শ্রেণিতে অবস্থান করছে, যা তালিকাভুক্ত মোট কোম্পানির প্রায় ৩৫ শতাংশ। পাশাপাশি বন্ধ ও অকার্যকর কোম্পানির তালিকায় ৩৩টি কোম্পানি রয়েছে। এ সংখ্যা মোট তালিকাভুক্ত মোট কোম্পানির ৯ শতাংশ।
ডিএসইর বন্ধ কোম্পানির তালিকায় থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে: একটিভ ফাইন কেমিক্যালস, অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স, আরামিট সিমেন্ট, আজিজ পাইপস, বারাকা পাওয়ার, বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং, দুলামিয়া কটন, এমেরাল্ড অয়েল, ফ্যামিলিটেক্স (বিডি), জিবিবি পাওয়ার, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনস, হামিদ ফেব্রিক্স, খুলনা পাওয়ার কোম্পানি, খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ,
মেট্রো স্পিনিং মিলস, মিঠুন নিটিং, নিউ লাইন ক্লোথিংস, নর্দার্ন জুট, নূরানী ডাইং,প্যাসিফিক ডেনিমস, প্রাইম টেক্সটাইল, রহিমা ফুড, আরএসআরএম, রিজেন্ট টেক্সটাইল, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ, রাষ্ট্রায়ত্ত শ্যামপুর সুগার মিলস, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিকস, তুং হাই নিটিং, ইয়াকিন পলিমার, জাহিন স্পিনিং ও রাষ্ট্রায়ত্ত উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরিজ।
এছাড়াও ভবিষ্যতে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে এমন কোম্পানির সংখ্যা ৪৩টি। বন্ধ কোম্পানিগুলো ব্যতীত এ তালিকায় থাকা অন্য কোম্পানিগুলো হলো অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, আনলিমায়ার্ন ডাইং, বাংলাদেশ সার্ভিসেস, বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স (বিআইএফসি), সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস, ঢাকা ডাইং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং, ডরিন পাওয়ার, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, গ্লোবাল হেভি কেমিক্যালস, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ),
ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইনটেক, জুট স্পিনার্স, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ, মেঘনা সিমেন্ট মিলস, ন্যাশনাল টি কোম্পানি, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, সাফকো স্পিনিং মিলস, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, তাল্লু স্পিনিং মিলস এবং জিল বাংলা সুগার মিলস।
এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, কমিশন ডিরেগুলেশনের দিকে যেতে চায়, যাতে স্টক এক্সচেঞ্জ স্বাধীনভাবে তার আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। ডিএসইর প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে কমিশন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।



