জাল সনদে চাকরি, মির্জাগঞ্জ শিক্ষা অফিসের দায়সারা তদন্ত!
দেশ প্রতিক্ষণ, মির্জাগঞ্জ: পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার মির্জাগঞ্জ ইউঃ দরগাহ্ শরীফ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক (হিন্দু ধর্ম) ছবি রানী খাসকেলের বিরুদ্ধে জাল সনদে চাকুরি লাভ, পদোন্নতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তবে এই জালিয়াতির অকাট্য তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অভিযুক্ত শিক্ষককে বাঁচানোর জন্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার একটি ‘দায়সারা’ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলে তীব্র ক্ষোভ ও গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ছবি রানী খাসকেল বিদ্যালয়টিতে যোগদান করেন। প্রথম এমপিওভুক্তির পর তিনি পর্যায়ক্রমে বি.এড স্কেল, টাইম স্কেল এবং ২০২৩ সালে দ্বিতীয় উচ্চতর স্কেল লাভ করেন। তবে তার উচ্চতর স্কেল প্রাপ্তির জন্য ব্যবহৃত ‘বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ড’-এর অধীনে বাকাই হরি গোবিন্দ সংস্কৃত কলেজের আদ্য (১৯৯৬), মধ্য (১৯৯৭) এবং উপাধি (১৯৯৮) পরীক্ষার সনদগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া ও জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যালয়ের নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চাকুরীর পরে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সনদ অর্জন করবে এই মর্মে যে রেজুলেশন দেখিয়েছেন এটা নিজের তৈরি করা ভুয়া রেজুলেশন । উক্ত রেজুলেশন এর বিষয় সাবেক শিক্ষক সাইদুর রহমান বলেন ঐ রেজুলেশনটা ছবি রানী খাসকেল কিভাবে তৈরি করছে সেটা আমাদের জানা নেই তবে ঐ রেজুলেশনে আমরা কেহ সই স্বাক্ষর করিনায় ওটাতে যাদের সই স্বাক্ষর আছে সবটাই ভূয়া। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে ছবি রানী খাশকেল যে কাগজপত্র দাখিল করেছেন তাহাতে ও দেখা যায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ঐ রেজুলেসন সত্যায়িত করেন নাই।
সচেতন মহলের প্রশ্ন ছবি রানী খাসকেলের সনদগুলো যে ভূয়া এটা জানার পরেও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শহিদুল ইসলাম কি করে ছবিরানী খাশকলকে অব্যাহতী দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলেন৷ তিনি ছুটি নিয়ে যে এই কোর্সগুলো সম্পন্ন করেছেন তারও কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ নেই। নেই ছুটি নেওয়ারও কোন প্রমানপত্র।
২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রবীন লাল রায় ছবি রানী খাসকেলের ভুয়া সনদ গুলো Emis সেলে আপলোড করে দ্বিতীয় উচ্চতার স্কেল এর ব্যবস্থা করেন। ওই সময় ছবি রানী খাসকেল ২০০৮, ২০০৯, ২০১০ সালের অর্জনকৃত সার্টিফিকেটগুলো আপলোড করেন নাই। সুতরাং সকল সার্টিফিকেট ভুয়া।
শিক্ষা অফিসারের বিতর্কিত ভূমিকা ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ: সনদ জালিয়াতির এই চাঞ্চল্যকর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয় (স্মারক নং-উমাশিকা /মির্জা/পটুয়া/ ২০২৬/৩৮। কিন্তু তদন্তের নামে চরম প্রহসনের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় মহলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখে অভিযুক্ত শিক্ষক ছবি রানী খাসকেলকে আইনি ও বিভাগীয় শাস্তি থেকে বাঁচাতে মির্জাগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শহিদুল ইসলাম মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে একটি একপেশে ও দায়সারা তদন্ত প্রতিবেদন জেলা শিক্ষা অফিসারের কার্যালয়ে প্রেরণ করেন। ওই প্রতিবেদনে অত্যন্ত চতুরতার সাথে উল্লেখ করা হয় যে ‘অভিযোগকারী তার অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন’।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, কোনো ফৌজদারি বা বিভাগীয় অপরাধে অভিযোগ প্রত্যাহার করলেই কি একজন শিক্ষকের ‘জাল সনদ’ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায়? জালিয়াতির সত্যতা যাচাই না করে কেবল অভিযোগ প্রত্যাহারের অজুহাতে একজন অপরাধীকে মুক্তি দেওয়া শিক্ষা অফিসারের পেশাদারিত্ব ও সততাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত প্রতিবেদন তৈরিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে নেপথ্যে থেকে সহযোগিতা করেছেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ শাহআলম (বিএসসি)ও মির্জাগঞ্জের একটি মাদ্রসার সুপার যিনি মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শহিদুলের সকল অপকর্মের সহযোগী।
এদিকে ৫/৭/২৬ তারিখ দুপুর ১২ টার সময় স্থানীয় দু’জন সাংবাদিক মির্জাগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে ছবি রানী কাসকেলের বক্তব্য জানতে চাইলে উক্ত বিদ্যালয়ের দপ্তরি মোঃ জলিল সাংবাদিকদের হাতুরি দিয়ে পিটাতে আসে। জলিল সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে যানা যার ছবিরানী খাসকেলের সাথে জলিলের রয়েছে দির্ঘ দিনের অবৈধ পরকীয়ার সম্পর্ক যা নিয়া বিগত কয়েক বছর আগে এই পরকিয়া প্রমিক যুগলকে রাতের আদারে ছবিরানীর বাসা থেকে এলাকবাসী আটক করে।
এদিকে সাংবাদিকদের মেরে ফেলার হুমকির বিষয় জলিলের নামে মির্জাগঞ্জ থানায় একটি সাধারন ডায়রী করেন বলে বিষয়টি নিশচিত করেন স্থানীয় সাংবাদিক তুহিন। এ বিষয়ে অভিযুক্ত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হন।
তবে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মুজিবুর রহমান জানান, এমন কোনো (দায়সারা তদন্তের) অভিযোগ এখনো আমার দপ্তরে আসেনি। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে, মির্জাগঞ্জ দরগাহ্ শরীফ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জানান, সনদ জালিয়াতি এবং তদন্তে অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় কোনো জালিয়াতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জাল সনদে চাকুরি করে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাতের এই ঘটনা এবং তা ধামাচাপা দিতে শিক্ষা কর্মকর্তার এমন বিতর্কিত ভূমিকা বর্তমানে ওই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন দাড় করাচ্ছে। উচ্চতর তদন্তের মাধ্যমেই কেবল এই জালিয়াতি চক্রের আসল চেহারা উন্মোচিত হতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।



