দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: মন্দাভাব কাটিয়ে দেশের পুঁজিবাজারে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। তবে বাজারের এই উত্থানকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক অসাধু কারসাজি চক্র। বন্ধ ও অস্তিত্ব সংকটে থাকা বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়ছে। এর পেছনে কারসাজির আশঙ্কা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং সন্দেহজনক লেনদেন ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা দুটি। তবে এরই মধ্যে কারসাজি চক্র থেমে নেই। উৎপাদন বন্ধ উসমানিয়া গ্লাস শেয়ার নিয়ে কারসাজি তদন্তে খতিয়ে দেখছে ডিএসই। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেডের দ্বিতীয় চুল্লির (ফার্নেস-২) উৎপাদন কার্যক্রম ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট থেকে অস্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে।

ফলে প্রায় তিন বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ, বছরের পর বছর শুধু লোকসান। সাত বছর ধরে লভ্যাংশ দেওয়া বন্ধ। ভবিষ্যতে ফের উৎপাদনে ফেরারও কোনো তথ্য নেই। ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা নিয়েও নিরীক্ষকের শঙ্কা রয়েছে। তা সত্ত্বেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরির শেয়ারের দাম রহস্যজনকভাবে বাড়ছে। কেন এই অস্বাভাবিক উত্থান এবং এর পেছনে কারা জড়িত, সেই রহস্য ভেদ করতে তদন্তে নেমেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।

শেয়ারটির এ ধরনের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বিধায় বিষয়টি বিশেষ নজরদারিতে রেখেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। শেয়ারের দাম বাড়ার চিত্রটি রীতিমতো বিস্ময়কর। ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে কোম্পানিটির কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল মাত্র ৩০ দশমিক ১০ টাকা, যা ছয় মাসের ব্যবধানে গত ১৪ জুলাই বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ টাকা। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে শেয়ারটির দাম বেড়েছে ৫০ দশমিক ২০ টাকা বা ১৬২ দশমিক ১৩ শতাংশ।

ডিএসই ও সিএসইর তথ্য বলছে, শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ ও ১৩ জুলাই শেয়ার লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। এর আগে মূল্যবৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে গত ৬ জুলাই ডিএসই কোম্পানিটিকে চিঠি দিলে তারা জানায়, শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়তে পারে— এমন কোনো অপ্রকাশিত তথ্য তাদের কাছে নেই। কোম্পানিটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা আর্থিক অবস্থানে এমন কোনো নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেনি, যা এই দরবৃদ্ধিকে যৌক্তিক করতে পারে।

২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫.৩৪ টাকায় এবং ঋণাত্মক নিট অপারেটিং ক্যাশফ্লো দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮৯ টাকায়। তবে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক ৭৩ টাকায়। এমন অবস্থায় কোম্পানিটির ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে নিরীক্ষক।

এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেছেন, উসমানিয়া গ্লাসের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়ার কারণ খুঁজতে তদন্ত শুরু হয়েছে। ডিএসইকে দ্রুত তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, সম্প্রতি কিছু লোকসানি ও দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একটি অসাধু গোষ্ঠী কৃত্রিমভাবে এসব শেয়ারের দাম বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে। এতে তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। তাই বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করতেই সাময়িকভাবে এসব শেয়ারের লেনদেন মাঝে মাঝে স্থগিত করা হচ্ছে।

১৯৮৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত উসমানিয়া গ্লাসের অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ১৭ কোটি ৪১ লাখ ১০ হাজার টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ১০৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ১ কোটি ৭৪ লাখ ১০ হাজার ৯০০। এর ৫১ শতাংশ রয়েছে সরকারের কাছে। এছাড়া উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে ২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকরী ১৫ দশমিক ৬৪ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ৩১ দশমিক ৩৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।