পুঁজিবাজারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতি আনতে বিএসইসির নয়া উদ্যোগ
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজার পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও দ্রুততা বাড়াতে প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এখন থেকে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার একটি বড় অংশ কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে, যাতে প্রতিদিনের কাজকর্মে অহেতুক দেরি না হয়। কমিশনের চেয়ারম্যানের সই করা একটি সাম্প্রতিক আদেশে এই পরিবর্তনের বিস্তারিত জানানো হয়েছে।
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ২০ (এ) ধারা অনুযায়ী এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজার সম্পর্কিত বেশিরভাগ আবেদন, প্রতিবেদন, চিঠিপত্র ও অন্যান্য নথিপত্র এখন থেকে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্বাহী পরিচালকের কাছে জমা দিতে হবে, আগের মতো চেয়ারম্যান বা কমিশনারদের দপ্তর ঘুরে আসতে হবে না।
এতদিন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি, বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, স্ব-নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিংবা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া কাগজপত্র প্রথমে চেয়ারম্যান বা কোনো কমিশনারের দপ্তরে পৌঁছাত, এরপর তা প্রাসঙ্গিক বিভাগে স্থানান্তরিত হতো।
এই বাড়তি ধাপের কারণে একটি সাধারণ আবেদন নিষ্পত্তি হতেও অনেক সময় লেগে যেত বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিলেন। নতুন ব্যবস্থায় সেই মধ্যবর্তী স্তর অনেকটাই বাদ পড়ছে, ফলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ সরাসরি বিষয়টি পর্যালোচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবে।
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য পুঁজিবাজারের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত করা এবং বাজারের বিভিন্ন পক্ষের সমস্যা দক্ষ ও সুশৃঙ্খলভাবে সমাধান করা। বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজে এ ধরনের বিকেন্দ্রীকরণ সাধারণত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় কমিয়ে আনে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা বাড়ায়, কারণ কোনো নথি কোন পর্যায়ে আটকে আছে তা চিহ্নিত করা সহজ হয়ে যায়।
তবে সব ধরনের নথিই বিভাগীয় পর্যায়ে জমা দেওয়া যাবে না। বিশেষভাবে স্পর্শকাতর পাঁচ ধরনের বিষয় এখনও সরাসরি কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছেই পাঠাতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে যেকোনো ধরনের অভিযোগ, তথ্য ফাঁসকারী বা হুইসেলব্লোয়ারের দেওয়া তথ্য ও অভিযোগ, কমিশনের নির্দেশে পরিচালিত অনুসন্ধান বা তদন্তের প্রতিবেদন, বিশেষ কোনো প্রতিবেদন, বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং কমিশন কর্তৃক পৃথকভাবে চিহ্নিত অন্য যেকোনো বিষয়। এই ব্যতিক্রমগুলো রাখার কারণ সহজেই অনুমেয় স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের তত্ত্বাবধান বজায় রাখা, যাতে বিকেন্দ্রীকরণের সুবিধা নিতে গিয়ে জবাবদিহিতায় কোনো ঘাটতি না হয়।
এ ছাড়া যেসব আবেদন বা অভিযোগ কমিশনের নির্ধারিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেগুলো অবশ্যই সেই ডিজিটাল মাধ্যমেই জমা দিতে হবে। এতে বোঝা যায়, কমিশন কাগুজে প্রক্রিয়া কমিয়ে ধীরে ধীরে পুরো ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও রেকর্ড-নির্ভর কাঠামোর দিকে নিয়ে যেতে চাইছে, যা ভবিষ্যতে জবাবদিহিতা ও তথ্যের সহজলভ্যতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে দৃশ্যমান গতি আসবে এবং বিনিয়োগকারী, তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে বিভাগীয় কর্মকর্তাদের হাতে বাড়তি দায়িত্ব দেওয়ায় তাদের কাজের মান ও গতি কতটা বজায় থাকে, তার ওপর নির্ভর করবে এই সংস্কারের প্রকৃত সাফল্য।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্তের মানও অক্ষুণ্ন থাকে।



